২০ ডিসেম্বর তিনি যখন চলে গেলেন, ব্র্যাকের ১২টি দেশের কার্যক্রমের কোন নিয়মিত পদেই তিনি ছিলেন না। দায়িত্ব তুলে দিয়ে গেছেন পরের প্রজন্মের কাছে। গত কিছু বছর ধরে তিনি ব্র্যাককে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন। এখানেই ব্র্যাক অন্যদের থেকে আলাদা। এই ডিফারেন্সটা যিনি তৈরি করে দিয়েছেন, তিনি ফজলে হাসান আবেদ। তার কাছে গোটা এনজিও কমিউনিটির, এমনকি এদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও অনেক কিছু শেখার আছে। শেখার আছে সরকারেরও।

রাজু নূরুল: আমি ব্র্যাকে কাজ করিনি কখনো। কিন্তু এনজিও সেক্টরে কাজের ১২ বছর পূর্ণ হয়ে গেল। এই ১২ বছরে শুধুমাত্র কাজের সূত্রে বাংলাদেশের অনেকগুলো জেলায় ঘুরেছি। ফলে খুব কাছ থেকে মানুষের বদলে যাওয়ার চিত্রটা দেখেছি। যদিও ৪৮ বছরের একটা দেশের তুলনায় ১২ বছরের অভিজ্ঞতা নেহায়েতই নগন্য। এই ১২ বছর আবার বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থে অগ্রযাত্রার বছর হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

নগরের বস্তি থেকে একেবারে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রাম কিংবা বান্দরবানের গহীন অঞ্চল - একটা সংগঠনের নাম উজ্জ্বল হয়ে চোখে পড়েছে, সেটা হল ব্র্যাক। আর এর পেছনে যার নিরলস কিন্তু নিরব সাধনা রয়েছে - তিনি ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ। উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্য আপা, দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচী থেকে ক্ষুদ্রঋণ, ব্র্যাক এদেশের সবখানে বিরাজমান। ১৯৭০ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ৭০ ডলার, আর দুই হাজার সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১৯৯০ ডলার। ১৯৭২ সালে এদেশের নারীরা গড়ে ৬.৫ জন সন্তানের জন্ম দিতেন, সেটা এখন ২.২! এর পেছনে সরকারের পাশাপাশি ব্র্যাকের মতো এনজিওদের ভূমিকা সবার আগে।

ব্র্যাকের জন্মই দিয়েছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগে সন্দীপের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে। সেখান থেকে সুনামগঞ্জের শাল্লা। তারপর আর পেছনে তাকায় নি। একে একে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে সংগঠনটি। ব্র্যাকের এই উদ্যোগ অসংখ্য এনজিওকে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এক ফজলে হাসান আবেদই অসংখ্য এনজিও'র উপদেষ্টা কাউন্সিলে কিংবা পরিচালনা পর্ষদে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যারা নিরলস মানুষের পাশে থেকে কাজ করে গেছে।

আজ থেকে দেড় দুই দশক আগেও এদেশের অসংখ্য জেলায় কিশোরীদের দেখা যেতো না। ১৩/১৪ বছরে বিয়ে। এখন সেসব জেলারই কোন এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিশোরী প্রায় অচেনা কোন বাইক ড্রাইভারের পেছনে চেপে শহরের কলেজে পড়তে আসে। শিক্ষায় অংশগ্রহনের হার ৯৬ শতাংশ; যেখানে প্রায় ৬০ ভাগের কাছাকাছি মেয়ে। পোলিও'র মতো দুরারোগ্য ব্যাধি প্রায় জাদুঘরে পৌঁছে গেছে। ব্র্যাকের স্বাস্থ্য আপা'রা এদেশের ঘরে ঘরে গিয়ে জন্মবিরতিকরণ পিল বিতরণ করার দৃশ্য আমাদের ছোটবেলার খুব নিয়মিত ঘটনা ছিল। এসব অবিশ্বাস্য অর্জনে বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি, এদেশে কাজ করা এনজিওগুলোর ভূমিকা ছিল ঈর্ষণীয়। যেখানে ব্র্যাকের ভূমিকা সবার আগে। আর পেছনে যেই মানুষটা চুপচাপ কলকাঠি নেড়েছেন তিনি সবার প্রিয় 'আবেদ ভাই'।

ব্র্যাকের কর্মসূচিভূক্তদের সঙ্গে ফজলে হাসান আবেদ

আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, এদেশের এনজিওগুলোর প্রধান সমস্যা হলো নেতৃত্বের সংকট। কোন একজন মৃত্যুর আগ অব্দি পদ আঁকড়ে বসে থাকেন। ফলে তিনি চলে যাওয়ার পর সেই সংগঠনটাও ধুঁকতে থাকে। ওয়ান ম্যান শো। কিন্তু ফজলে হাসান আবেদের চোখ সুদূরপ্রসারী। এখানেই তিনি অনন্য। ২০ ডিসেম্বর তিনি যখন চলে গেলেন, ব্র্যাকের ১২টি দেশের কার্যক্রমের কোন নিয়মিত পদেই তিনি ছিলেন না। দায়িত্ব তুলে দিয়ে গেছেন পরের প্রজন্মের কাছে। গত কিছু বছর ধরে তিনি ব্র্যাককে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন। এখানেই ব্র্যাক অন্যদের থেকে আলাদা। এই ডিফারেন্সটা যিনি তৈরি করে দিয়েছেন, তিনি ফজলে হাসান আবেদ। তার কাছে গোটা এনজিও কমিউনিটির, এমনকি এদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও অনেক কিছু শেখার আছে। শেখার আছে সরকারেরও।

স্যার ফজলে হাসান আবেদ ছিলেন অন্তর্মুখী, নির্লোভ মানুষ। তিনি চাইলে ব্যক্তিগতভাবে অনেক সম্পদের মালিক হতে পারতেন। কিন্তু সম্পদের পেছনে ছুটলে তাঁর জীবনের ব্রত থেকে দূরে সরে যাবেন বলে নিজের সম্পদের দিকে ছোটেননি তিনি। একবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার নিজের কিছু নেই। আমার নিজের বাড়ি নেই, ভাড়া বাসায় থাকি। যখন ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করি, তখনই নিজের জন্য কিছু করব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কারণ নিজের সম্পদ গোছানোর ব্যবসা করতে গেলে গরিবদের সাহায্য করতে পারব না।’ তিনি বিকাশের মতো আধুনিক প্রযুক্তি যেমন এনেছেন, তার তৈরি করা ব্র্যাক ব্যাংক কিংবা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ও অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র।

ফজলে হাসান আবেদের চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে যুগের অবসান হলো। তার কাজের মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ করবে। তার গড়ে যাওয়া মডেলের কার্যকারিতার প্রমাণও ভবিষ্যতে হবে। কিন্তু একটা ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্য মুক্ত, শিক্ষিত আর নারী পুরুষের বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অগ্রযাত্রায় তার অবদান স্মরনীয় হয়ে থাকবে। তিনি এদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার নাবিক হিসেবে চিহ্নিত হবেন।

স্যার ফজলে হাসান আবেদ, আপনার প্রতি অতল শ্রদ্ধা।

(লেখক- ডিরেক্টর, প্রোগ্রাম, পলিসি এবং এডভোকেসি; ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ) 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা