ব্রিটেনের হাসপাতালের এই নার্সদের পলিথিন ব্যাগ গায়ে ডিউটির ছবি বিভিন্ন সেলিব্রিটিরা শেয়ার দিয়েছিলেন। আর বাংলাদেশী চিকিৎসকদের খোঁচাখুচি করছিলেন। তাদের অবগতির জন্য জানাই, ওই হাসপাতালে ডিউটি করা ৫০% নার্সই এখন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আর ওই ওয়ার্ডের ডিউটি করা সবাই।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ। অর্থনীতির চাকা থমকে গেছে। চাকরি হারিয়েছে কিংবা হারাতে যাচ্ছে অজস্র চাকরিজীবী। কষ্টের টাকা জমিয়ে যে তরুণ একটি স্টার্টআপ শুরু করেছিল, সেই যাত্রা থমকে গেছে ইতিমধ্যেই। গরীব মানুষগুলো হিমশিম খাচ্ছে দুমুঠো ভাতের সংস্থান করতে। আরবান অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের মেন্টাল হেলথ একেবারেই ইমব্যালেন্সড হয়ে গিয়েছে। প্রতিটি ঘরের বয়োজ্যেষ্ঠরা ভয়াবহ ঝুঁকির মাঝে বেঁচে আছে, বলাবাহুল্য একপ্রকার নিঃশ্বাস নিচ্ছে শুধু। বদলে গেছে শহর, বদলে গেছে দেশ, বদলে গেছে গোটা পৃথিবী।

কিন্তু উহান যখন করোনাক্রান্ত হলো, মৃত্যুর মিছিল যখন বড় হতে শুরু করলো, তখনো বাংলাদেশের প্রস্তুতি নেবার অনেক সময় ছিল, সুযোগ ছিল। তবু কেন আজ আমাদের এত দুর্দশা? কাকে প্রশ্ন করবেন? তারচেয়ে বড় কথা এসবের দায় দেবেন কে? চিন্তার কিছু নেই, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংকটকালীন সময়ে বলির পাঁঠা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন এদেশের ডাক্তাররা। জি হ্যাঁ, আমাদের ডাক্তাররাই এসবের জন্য দায়ী! 

লেখার এই পর্যায়ে ব্যক্তিগত দুটি ব্যাপার বলে রাখা ভালো।

  • যিনি এই লেখাটি লিখছেন, তার বাঁ হাতের শোল্ডার ডিসলোকেট হয়ে আছে দীর্ঘ দিন, হাত এখনো ঠিক হয়নি। যে ডাক্তার দেখছিলেন লেখককে, তিনি এখন আর চেম্বার করছেন না। কতদিন এর জন্য ভুগতে হবে, তার কোনো দিনক্ষণ হিসেব করার সুযোগ নেই।
  • লেখকের বাবার প্রতি সপ্তাহে ডায়ালাইসিস করাতে হয়, দুটো কিডনিই নষ্ট। লেখকের মা ক্যান্সারের প্যাশেন্ট। এবং লেখক ভালো করেই বাস্তবতা টের পান, করোনাভাইরাসের এই সময়টায় এই দুজনের কেউ যদি কোনোভাবে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে তাদের দুজনকে নিয়েই হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরতে হতে পারে, কোনো হাসপাতালই রোগী এলাউ না করতে পারে। এরপর কী হতে পারে, তা না ভেবে লেখক আলোচনায় থাকতে চাইছেন।

এই যে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হলো, এর দায় কার? 

লেখাটি যখন লিখছি, তখন হাসনাত কালাম সুহান ভাইয়ের সৌজন্যে পেলাম এক খবর। সরাসরি তুলে ধরছি তার স্ট্যাটাস- ‘ব্রিটেনের হাসপাতালের এই নার্সদের পলিথিন ব্যাগ গায়ে ডিউটির ছবি বিভিন্ন সেলিব্রিটিরা শেয়ার দিয়েছিলেন। আর বাংলাদেশী চিকিৎসকদের খোঁচাখুচি করছিলেন। তাদের অবগতির জন্য জানাই, ওই হাসপাতালে ডিউটি করা ৫০% নার্সই এখন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আর ওই ওয়ার্ডের ডিউটি করা সবাই। আপনার আমার আবেগী চাহিদার কারণে কারও জীবন বিপন্ন করতে বলার আগে একটু ভাবা উচিত। ডাক্তার, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং সকল পর্যায়ের ফার্স্ট রেসপন্ডার্সদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত না করে- তাদের যুদ্ধে ঠেলে দেয়া অবিবেচনা প্রসূত। চিকিৎসা করতে গিয়ে তারা উল্টো সুপার স্প্রেডার হবেন।’

একই কথা কয়েকদিন এগিয়ে চলোতে প্রকাশিত এক লেখায় লিখেছিলেন ডাঃ সৌরভ চৌধুরী, ‘টেস্ট করার সুবিধা দেয়া না হলে হাসপাতালগুলো কোভিড-১৯ আক্রান্ত হবার উপসর্গ মিলে যায়, এমন কোন রোগী রাখতে ভাল বোধ করবে না এটাই স্বাভাবিক। আর টেস্ট করার যাবতীয় অথরিটি আইইডিসিআর এর কাছেই পুঞ্জীভূত। আমি একটা রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষাই করতে পারবো না, অথচ সেই রোগী নিয়ে আমার আরো কয়েক ডজন বা কয়েকশ বা কয়েক হাজার রোগীকে বিপদে ফেলবো? সাথে কয়েক ডজন বা কয়েকশ এমপ্লয়িকেও? সাধারন গণিত এটা, এক বনাম একশ এর মতো। চোখ বেঁধে দেয়া মানুষকে আপনি তলোয়ার যুদ্ধে আমন্ত্রণ জানালে সে কি খেলবে? নাকি খেলা থেকে নাম প্রত্যাহার করবে?’

আরও একটি প্রসঙ্গে চলছে সমালোচনা। প্রাইভেট চেম্বার কেন বন্ধ? কেন ডাক্তাররা এখন চেম্বার করছেন না? জীবনের তাগিদে অমি রহমান পিয়াল ভাই থাকেন সুইজারল্যান্ডে। সেদিন এক লেখায় সুইজারল্যান্ডের পরিস্থিতির কথা বলছিলেন, ‘করোনার চিকিৎসা হয় স্পেশাল হাসপাতালে। নরমাল কোনো ক্লিনিক বা চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রে না। সুইজারল্যান্ডে সব প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ। তাহলে কি সুইস ডাক্তাররা ভীরু? তারা পালিয়েছে?' খেয়াল করে দেখুন পাঠক, সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে সব প্রাইভেট প্র্যাক্টিস বন্ধ!

ডাঃ সৌরভ চৌধুরীও এ প্রসঙ্গে উত্তর দিয়েছিলেন যথাযথ,

‘প্রাইভেট চেম্বার কোন জরুরী চিকিৎসা সেবার জায়গা নয়। সকল উন্নত দেশেই এখন চেম্বার/বহির্বিভাগ বন্ধ করা হয়েছে বা হচ্ছে। আউটব্রেকের প্রোটোকলই এটা, জরুরী সার্ভিস ছাড়া বাকি সব গ্যাদারিং বন্ধ থাকবে। কাজেই "খুলনায় এখন কসাইরা আর চেম্বার করছে না", "অমুক কার্ডিওলজিস্টের চেম্বারে লেখা রোগী দেখা বন্ধ, দেখুন কেমন অমানুষ এরা" টাইপের ছ্যাচড়ামি বন্ধ করুন! একেকজন সিনিয়র চিকিৎসক করোনা আক্রান্ত হওয়া মানে বিশাল লস! তারা বয়স্ক, হাই রিস্ক গ্রুপে পড়েন। আজ দেশের সিনিয়র কয়েকজন কার্ডিওলজিস্ট, কয়েকজন নিউরোলজিস্ট, কয়েকজন অনকোলজিস্ট আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে জাতির কি পরিমান ক্ষতি হবে? দেশে আছেনই তারা কয়জন? করোনার এই কয়েক মাসের পরে দেশে কি আর ডাক্তার লাগবে না? চেম্বারে নন-আর্জেন্ট চিকিৎসার জন্য বয়স্ক ডাক্তারদেরকে মৃত্যুঝুঁকি নিতে চাপ দেয়াটা কোন মনুষ্যত্বের পর্যায়ে পরে?’

এবার ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। আচ্ছা, এই যে করোনা রোগী না হয়েও বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে হচ্ছে, এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? উত্তর, এর দায় প্রধানত ক্লিনিক মালিকদের। দেশের সবচেয়ে বড় ৫০ টা বেসরকারি হাসপাতালের ৯০% পরিচালনা পরিষদে আওয়ামী লীগের নেতা। সরকার কেন রিকুইজিশন করে চিকিৎসা নিশ্চিত করছে না? ল্যাব এইড হাসপাতালের মালিক আওয়ামী লীগের এমপি। অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনেক ডাক্তার নার্সদের বেতন না দিয়ে বিদেয় করে দিয়েছে। এই হলো আমাদের প্রিকোউশন, এই হলো আমাদের করোনা প্রতিরোধের প্রস্তুতি।

তারপর আসা যাক পিপিই প্রসঙ্গে। বাজারে চলমান বক্তব্য, "এখন তো পিপিই সংকট নেই, এখন কেন ডাক্তাররা রোগীর গায়ে হাত দিতে চান না?" ডাঃ সৌরভ চৌধুরী এই প্রেক্ষিতে বলছিলেন, ‘খুব চালাকি করে বলা একটা কথা। শুরুতেই আইডিয়েল পিপিইগুলো দখল হয়ে যাবার পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে আস্তে আস্তে ডাক্তার-নার্সদের পিপিই দেয়া শুরু হয়। কি পরিমাণ জানেন? জানার চেষ্টা করেছেন? একেকটা হেলথ কমপ্লেক্সে চার/পাঁচ/আট/দশ পিস করে! ডাক্তার আছে পাচ-সাত বা দশজন, নার্স আছে দশ-বারো জন, সাথে সাপোর্টিং স্টাফ আরো কিছু। সেখানে গোটা দশেক ওয়ান টাইম ইউজ পিপিই দিয়ে নাম ফুরানোর মানে কি? একেকটা মেডিকেল কলেজে একেক শিফটেই ডাক্তার-নার্স থাকেন সত্তুর আশি জন। তিন বেলায় দুই-তিনশ এর মত। সেখানে গিয়েছে একশ পিস, দেড়শ পিস মাত্র! একবা দুই দিনের খোরাক!’

এত কিছু বলার একটাই কারণ। এখন বিভাজনের সময় নয়। ডাঃ জয়নাল আবেদিনের এই কথাটাই উল্লেখ করি, ‘ডাক্তার ভার্সেস জনগণ ভায়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী... এই যে পারস্পরিক দোষারোপ, রাগ, বিদ্বেষ, অভিমান, গালিগালাজ... এর রেজাল্ট খুবই খারাপ আসবে। খুবই খারাপ৷ যা হবার হয়ে গেছে। এখন সামনে এগোবার কথা, এখন সহনশীলতা ধরে রাখার সময়।’

শেষ করছি এক স্কুলবন্ধুর গল্প বলে।

বন্ধু একজন ডাক্তার। ৩৯ বিসিএস। অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন। বিয়ে হয়েছে কেবল এক মাস। আমার সেই ডাক্তার বন্ধুর কাল করোনাভাইরাস পজিটিভ এসেছে।

না, আমার বন্ধু পালিয়ে বেড়ায়নি। হিপোক্রেটিক ওথ নিয়েছিল সে মানুষের সেবা করবে। নীলফামারির কিশোরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ছিল; ছিল না কোনো পিপিই। তবু সে পালিয়ে বেড়ায়নি। সবাই পালিয়ে বেড়ায় না।

কাউকে না কাউকে তো বলির পাঁঠা বানাতে হবে। বাংলাদেশের ডাক্তারদের সবাই যে পূতপবিত্র মানসিকতার, তা বলছি না। কিন্তু একরকম জেনারালাইজ করে এই যে ধমক দেওয়া, এই যে মনোবল ভেঙে দেওয়া, যুদ্ধের শুরুতেই সবচাইতে জরুরি ও চৌকস বাহিনীকে মানসিকভাবে ধাক্কা দেওয়া- এর কোনো প্রয়োজন ছিল না। প্রয়োজন ছিল না জনগণকে ডাক্তারদের মুখোমুখি করিয়ে দেওয়ার। কতখানি এডমিনিস্ট্রেটিভ ব্যর্থতা, কতখানি সমন্বয়হীনতার ধারাবাহিকতায় আজ বাংলাদেশ করোনাভাইরাসের চারণভূমি, সেটা সবাই জানে। বিশ্বাস করুন, সবাই।

ওর শেষ পর্যন্ত কী হবে, জানা নেই। শুধু এতটুকুই জানি, আমার বন্ধু তার দায়িত্ব থেকে পালিয়ে বেড়ায়নি। বাংলাদেশের সব ডাক্তার পালিয়ে বেড়াচ্ছে না।

 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা