লকডাউনের শুরুর দিকে, গণিত ক্লাস নেয়ার সময় একজন শিক্ষিকা হিসাবে ভুল করে ফেলায় তাকে নিয়ে কী বীভৎস হাসি-তামাশাতেই না মেতে উঠেছিল ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বড় একটা অংশ। অথচ খুব কম মানুষকেই তখন দেখা গিয়েছিল ওই শিক্ষিকার অবস্থাটা চিন্তা করতে।

"...তার অনলাইনে ক্লাস নিয়ে অভ্যাস নাই। টেনশনে একটা ছোট ভুল হতেই পারে। তাই বলে তার ছবি নিয়ে এইরকম ট্রল হবে? কী ল্যাঙ্গুয়েজ, কী ভাষা! মানে, এরা কী শিখছে? এরা কী ধরনের স্টুডেন্ট? একজন টিচারকে কীভাবে সম্মান করতে হয় শেখে নাই, একজন মাকে কীভাবে সম্মান করতে হয় শেখে নাই। এদের দিয়ে হবেটা কী সোসাইটিতে, তুমি আমাকে বলো।"

"আসলে কিছু করার নাই। ইগনোর করা ছাড়া আর কিছু তো করার নাই। আর তাছাড়া ফেসবুক তো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির লেভেল নামায় দিছে। কী করতে পারি আমরা?..."

নিশ্চয়ই মনে আছে সবার, লকডাউনের শুরুর দিকে, এপ্রিল মাসে সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশনে তৃতীয় শ্রেণীর গণিত ক্লাস নেয়ার সময় একজন শিক্ষিকা হিসাবে ভুল করে ফেলায় তাকে নিয়ে কী বীভৎস হাসি-তামাশাতেই না মেতে উঠেছিল ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বড় একটা অংশ। তাদের এমন ভাব ছিল যেন কারো কখনো ভুল হয় না। যদি কেউ ভুল করেই ফেলে, তার মুণ্ডুপাতই একমাত্র সমাধান। 

অথচ খুব কম মানুষকেই তখন দেখা গিয়েছিল ওই শিক্ষিকার অবস্থাটা চিন্তা করতে। খুব কম মানুষই এটা অনুধাবন করতে পেরেছিল যে একজন শিক্ষক বা শিক্ষিকা কখনো ইচ্ছা করে কিংবা নিজের যোগ্যতার অভাবে এরকম অঙ্ক ভুল করবেন না, বরং তার এই ভুল করার পেছনে নতুন একটা মাধ্যমে ক্লাস নেয়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার অভাবজনিত দুশ্চিন্তাও ভূমিকা রাখতে পারে।

এমনটাও নয় যে গত কয়েক মাসে আমরা নিজেদের শুধরে নিয়েছি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনলাইন ক্লাস শুরু হওয়ার পর শিক্ষকদের নিয়ে ট্রলের পরিমাণ আরো বেড়েছে। অনলাইনে ক্লাস নেয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা তো দূরে থাক, স্মার্টফোন-ট্যাব-ল্যাপটপ ইত্যাদি ডিভাইসেই অনভ্যস্ত শিক্ষকরা ক্লাস নিতে গিয়ে কোনো ভুল করে ফেললেই, কিংবা কিছু বুঝতে না পারলেই, সেগুলো নিয়ে ট্রল-মিম ইত্যাদি বানিয়ে ভাইরাল করা হয়েছে ফেসবুকে। 

আশফাক নিপুণের 'অযান্ত্রিক' শর্ট ফিল্মে আমরা দেখেছিলাম অনলাইন ক্লাস নেয়ার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষকের সংগ্রামের চিত্র। সেই একই রকম বিষয়ই উঠে এসেছে গৌতম কৈরীর শর্ট ফিল্ম 'করোনাকাল'-এও। ২৫ বছরের অভিজ্ঞ একজন শিক্ষিকা গণিত ক্লাস নিতে গিয়ে সামান্য ভুল করে ফেলায় তাকে কীরকম অপমানিত-অপদস্ত হতে হয়, সেটি খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই শর্ট ফিল্মে।

তবে শিক্ষকদের এই সংগ্রামের চিত্রের পাশাপাশি, এই শর্ট ফিল্মে আরো উঠে এসেছে চাকরি হারানো এক যুবকের কাহিনী। এবং সেটিও কোনো অংশে কম হৃদয়স্পর্শী নয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংসার চালানোর জন্য সে যে পদক্ষেপ নেয়, তার সাথে একাত্ম অনুভব করতে পারবেন অনেকেই। তাছাড়া এই শর্ট ফিল্মে রয়েছে মিষ্টি একটা রোমান্টিক সম্পর্কের গল্পও, যা শর্ট ফিল্মটির শেষ ভাগে এসে দর্শককে দারুণ একটা বার্তাও দেবে। শিখিয়ে দেবে, একটা সম্পর্কে দুজন মানুষের পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস ও নির্ভরতার জায়গাটি ঠিক কেমন হওয়া উচিত।

সব মিলিয়ে মাত্র ২২ মিনিটের শর্ট ফিল্মটিই বর্তমান পরিস্থিতির একাধিক দিককে খুব নিখুঁতভাবে ছুঁয়ে যায়। এটি এমনই একটা কাহিনী, যা নিঃসন্দেহে দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে, তাদেরকে নতুন করে ভাবাবে। পাশাপাশি সামান্যতম বিষয় নিয়েও যারা অনলাইন ট্রল বা বুলিংয়ে মেতে ওঠে, সজোরে তাদের গালে এক অদৃশ্য চড়ও কষিয়ে দেবে এই শর্ট ফিল্ম। 

ইয়াশ রোহান, নাদিয়া আফরিন মিম, নরেশ ভুঁইয়া ও শিল্পী সরকার অপু — প্রত্যেক অভিনেতাই দারুণ কাজ করেছেন। ইয়াশের সাথে তার মা কিংবা প্রেমিকার দৃশ্যগুলো চোখে পানি এনে দেয়ার মতো। ইয়াশ যে ভবিষ্যতে অনেক বড় কিছু হতে চলেছেন, তার সব ইঙ্গিতই পাওয়া যায় তার এই কাজটি, কিংবা 'মশাল' ও 'শহর ছেড়ে পরাণপুর' থেকে। 

এবারের ঈদে বাংলাদেশি টেলিভিশনে প্রচুর ভালো কাজ হয়েছে। সেগুলোর ভিড়ে 'করোনাকাল' হয়তো চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু এমন ভালো একটা কাজের সঠিক মূল্যায়ন হওয়া খুব জরুরি। যাদের হাতে কিছুটা অবসর সময় আছে, দেখে নিতে পারেন চমৎকার এই শর্ট ফিল্মটি।

* প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা