আমেরিকার শাসকেরা তাকে ডাকেন ভণ্ড, কাপুরুষ, দেশদ্রোহী। আবার সাধারণ মানুষজন তাকে অকুন্ঠভাবে ভালোবাসে। সাবেক সিআইএ এজেন্ট এডওয়ার্ড স্নোডেন কী এমন করেছিলেন, যে কারনে এত অজস্র বন্ধু ও শত্রু তার?

'স্যাপিয়েন্স' অথবা 'হোমো ডিউস'খ্যাত ইউভাল নোয়া হারারি'র কলামগুলো আমরা অনেকেই নিয়মিত পড়ি। ইসরায়েলে জন্ম নেয়া এই তুখোড় ইতিহাসবিদের সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত হওয়া একটা লেখা ভাবিয়েছে অনেককেই। যে লেখায় তিনি  আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, মহামারী করোনাভাইরাস শুরু হওয়ার পরে অনেক দেশই যেভাবে 'মহামারি নিয়ন্ত্রণের জরুরি প্রক্রিয়া'র অংশ হিসেবে তাদের নাগরিকদের কাজকর্ম, গতিবিধি, কথাবার্তাকে পুরোপুরি রেকর্ড ও নিয়ন্ত্রণ করে রাখার যাবতীয় পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে, এই বিষয়টি মহামারী চলে গেলেও থাকবে। আজীবন থাকবে। মানুষের বাকস্বাধীনতা বলে আর কিছু থাকবেনা কোথাও।

জর্জ অরওয়েলের 'নাইন্টিন এইটিফোর' উপন্যাসের সেই লাইনটির মতন; 'The Big Brother is watching you' হয়ে যাবে সব। মানুষের ভিন্নমত, চলাচল, কথাবলার স্বাধীনতা থাকবেনা। জনগনকে কব্জায় রাখতে পারলে যেহেতু ক্ষমতায় থাকা সহজ হয়ে যায়, বিভিন্ন দেশ নানাভাবে অনেকদিন ধরেই জনগনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সামনেও চালাবে। হীরক রাজা'র যন্তরমন্তর হয়ে যাবে একেকটি রাষ্ট্র। যদিও কোনো শাসকই তা স্বীকার করে না, করবেও না কোনোদিন। উপরে উপরে সবাই-ই উদার,  সাধুসন্ত, প্রজা-অন্তপ্রান।

যেরকমটি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র আমেরিকাও। যারা দাবী করেন, তাদের নাগরিকেরা মত প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বাধীন ও রাষ্ট্রের কোনো অন্যায় নিয়ন্ত্রণও নেই তাদের উপর। কিন্তু এই কথা যে কতটা মিথ্যে, ২০১৩ সালের দিকে এসে তা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন একজন। খোদ আমেরিকান রাষ্ট্রযন্ত্রের কথা ও কাজের দ্বিচারিতার এক বিশাল ভণ্ডামির মুখোশ সাহসের সাথে উন্মোচন করে দিয়েছিলেন সেই মানুষটি। আমেরিকার সেই কম্পিউটার জিনিয়াসের নামটা মনে পড়ে? হ্যাঁ, এ্যাডওয়ার্ড স্নোডেনের কথাই বলছি। যাকে চেনে না, এই কমলালেবু পৃথিবীতে এমন মানুষ খুব কমই আছে।

এ্যাডওয়ার্ড স্নোডেন এর পরিচয় নানাভাবে দেয়া যায়। কম্পিউটার এক্সপার্ট, সিআইএ এজেন্ট, গোয়েন্দা, গুপ্তচর, বিপ্লবী... অথবা একসাথে সবকিছু। যার জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনার এলিজাবেথ সিটিতে। সেনাবাহিনীতে যুক্ত হতে চেয়েও পারেননি। কারণ- প্রশিক্ষণের সময়ে পা ভাঙ্গে তার। পরে যুক্ত হন এনএসএ'র সাথে। সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) এর আইটি সিকিউরিটির দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। অথচ তার ছিলো না কম্পিউটার বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি। তবু সহজাত প্রতিভা নিয়েই কাজ করে যাচ্ছিলেন। কম্পিউটার বিষয়ে নিজের ঈর্ষণীয় দক্ষতায় ক্রমশ হয়ে বসেছিলেন সিআইএ'র আইটি ডিপার্টমেন্টের কেউকেটা একজন।

এরকমই এক সময়ে তিনি এনএসএ'র ডাটাবেজে থাকা কিছু হাই-ক্লাসিফাইড ইনফরমেশন এর সন্ধান পান। এমন সব সংবাদ, যেগুলো ফাঁস হলে সরকারের সফেদ-চেহারায় পড়বে অমোচনীয় কালি। আমি যখন স্নোডেনের জীবন নিয়ে নির্মিত 'স্নোডেন' সিনেমাটা দেখেছি, সিনেমার এই অংশে এসে বারবার মনে হয়েছে- কী দরকার ছিলো এত কিছু করার? সরকারের গোমর ফাঁস করে নিজের জীবনটা এভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়ার যে সাহস, সেটা না করলেই তো জীবনটা নিরাপদ হতো। নিরাপদ যে জীবনের দিকে না হেঁটে স্নোডেন এগোতে থাকেন এক অন্য পথে। যে পথে শুধু সাহস সম্বল। আর কিছু না।

'স্নোডেন' সিনেমার পোস্টার

যে সাহসের মাশুল হিসেবে গত ছয় বছর ধরে তিনি নিজের দেশ থেকে নির্বাসিত। দেশ থেকে পালিয়ে আগন্তুক হয়ে আছেন রাশিয়ার মস্কোতে। সরকারের কী কী তথ্য ফাঁস করেছিলেন স্নোডেন, যার জন্যে এতটা শাস্তি পেতে হচ্ছে তাকে? ২০০৭ সালের টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনার পরে তৎকালীন ইউএস প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ গোপনে আড়ি পেতে জনগনের কথাবার্তা শোনার জন্যে ‘প্রিজম’ চালু করেন। যেটার মাধ্যমে নাগরিকের যেকোনো তথ্য, কথাবার্তায় আড়ি পাততে পারতো সরকার। বুশ প্রশাসন প্রিজমের পাশাপাশি চালু করেছিলেন আরেকটি আড়ি পাতার পদ্ধতি;  মাসকুলার। এছাড়াও জনগনের বাক-স্বাধীনতা ও চলাফেরার স্বাধীনতাকে নষ্ট করে এরকম বেশ কিছু গোপন সিস্টেম চালু করা হয়েছিলো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই! হারারির কলাম ও জর্জ অরওয়েলের বইয়ের সাথে মিল পাচ্ছেন তো? এনএসএ থেকে এসব মারাত্মক তথ্যই আবিষ্কার করেছিলেন স্নোডেন!

প্রিজম ও মাসকুলার সংক্রান্ত সবকিছু এরপর গোপনে কপি করে নেন তিনি।  আমেরিকার আইনজীবী ও সাংবাদিক গ্লেন গিল্ডওয়াল্ডের সাহায্য নেন। তাকে পৌঁছে দেন সব কাগজপত্র। এরপর স্নোডেন দেশ ছেড়ে চলে যান হংকং। আশ্রয় নেন সেখানে। ততক্ষণে শুরু হয়েছে ধামাকা। স্নোডেনের কথামত গিল্ডওয়েল তখন একের পর এক বিস্ফোরক প্রকাশ করছেন 'দ্য গার্ডিয়ান' এ। একেকটা বিস্ফোরক সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে, কেঁপে কেঁপে উঠছে হোয়াইট হাউজের ভিত্তিভূমি। আন্তর্জাতিক হুলিয়া জারি হচ্ছে স্নোডেনের নামে। মোস্ট ওয়ান্টেড আমেরিকান... তকমা এঁটে যাচ্ছে নামের সাথে। তবে কেউই তখনো জানেনা স্নোডেন ঠিক কোথায় আছেন আত্মগোপনে। 

স্নোডেন নিজেই সবাইকে জানিয়ে দিলেন, তিনি আছেন হংকং এ। হংকং এর উপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে। এরমধ্যে উইকিলিকিস এর প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের সাথেও কথাবার্তা হয় স্নোডেনের। অ্যাসাঞ্জ, স্নোডেনকে ইকুয়েডরে আশ্রয় নিতে বলেন। অ্যাসাঞ্জ নিজেও লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয়ে ছিলেন। কিন্ত স্নোডেনের আর ইকুয়েডর যাওয়া হয় না। কোনো এয়ারলাইন্স এন্ট্রি না দেয়ায় শেষমেশ রাশিয়ার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে সে। রাশিয়া প্রথমে গাইগুই করলেও পরে আশ্রয় দেয় স্নোডেনকে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প, স্নোডেনকে প্রকাশ্যেই ডাকেন 'বিশ্বাসঘাতক'

স্নোডেন এখনো রাশিয়াতেই আছেন। মাঝে জলঘোলাও হয়েছে অনেক। সময়ের বিভিন্ন প্রকোষ্ঠে নানা মত-পথের দল-উপদল বহুভাগে বিভক্ত হয়ে তার আলোচনা, সমালোচনা করেছে, করছে, করবেও। আমেরিকার শাসকেরা তাকে বিশ্বাসঘাতক, ভণ্ড, কাপুরুষ ডাকছে। ওবামা থেকে ট্রাম্প... কেউই রেয়াত দিচ্ছেন না তাকে। আবার অদ্ভুত বিষয়, খোদ আমেরিকার মানুষজনই তাকে জানাচ্ছে অকুন্ঠ ভালোবাসা ও সমর্থন। অম্ল-মধুর, টকঝাল মিশিয়ে এক নিন্দিত ও নন্দিত জীবনই কাটাচ্ছে স্নোডেন। যে জীবনে সৃজাত'র 'তফাত' কবিতার শেষ চারলাইন হয়ে যাচ্ছে ধ্রুবসত্য-

মানুষ থেকেই মানুষ আসে
বিরুদ্ধতার ভীড় বাড়ায়
তোমরা মানুষ, আমরা মানুষ
তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়।

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন

 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা