''দুনিয়ায় এতো মানুষ মারা যাচ্ছে, তাতে কারো কোনো বিকার নেই! আর ঐ একজন মারা গেলো, তাতেই সবার ঘুম হারাম! কেন?''

ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবার চিকিৎসা চলছে। বাবাকে ঢাকায় নিয়ে গেছেন মা। আর নবম শ্রেণীতে অধ্যয়ণরত কিশোরী মেয়েটা বাড়িতে একা। এই অসহায়ত্বেকে সুযোগ বানিয়ে ফেললো নরপিশাচেরা। অসহায় মেয়েটাকে বাড়িতে একা পেয়ে তাকে ধর্ষণ করলো। তার ওপর চালানো হলো পাশাবিক নির্যাতন। তারপর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হলো। কী নির্মম! না জানি এই বাচ্চা মেয়েটার কতটা কষ্ট হয়েছে। শেষ নিশ্বাসটা ছাড়ার আগে হয়তো পুরো দুনিয়ার ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে গিয়েছিলো তার। মাত্র ১৪ বছরের জীবনের সমাপ্তি ঘটলো এক বুক অবিশ্বাস নিয়ে।

মহামারি করোনা থামাতে পারেনি যে ধর্ষণ, সেটা আমরা থামাবো কী করে? তবুও আমরা সবাই ‘কমবেশি’ এই নৃশংস ঘটনার নিঃশর্ত বিচার চাই, কমবেশি বলার কারণ, কেউ কেউ সরাসরি ‘ক্রসফায়ার’ চায়। তাদের আর বিচার ব্যবস্থায় বিশ্বাস নেই। তাদেরও বুক ভর্তি সেই অবিশ্বাস। ঠান্ডা মাথায় একটু ভেবে দেখুন, এই ক্রসফায়ার কী আসলেই বিচার, নাকি বিচারের মোড়কে পেচানো সাময়িক সান্ত্বনা। এটা কি বৈধ কোনো উপায়?

একটু বোঝার চেষ্টা করুন, একটি অপরাধ দিয়ে আরেকটি অপরাধকে কখনোই বৈধ প্রমাণ করা যায় না। বিচার বহির্ভূত যেকোনো হত্যায় নিরাপরাধীদের নিরাপত্তা সংকিত হয়। এই ক্রসফায়ারকে সমর্থন দিলে আপনি নিজেকেও মেরে ফেলার এখতিয়ার দিয়ে দিলেন। অতঃপর, নিরাপরাধী আপনিও হয়ে উঠতে পারেন ভয়ংকর কোনো সন্ত্রাসী। তখন মেনে নিতে পারবেন তো? মনে হয় না। 

এই অবৈধ ব্যাপারগুলোকে বৈধতা দিয়ে দিয়ে আমরা এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছি যে এখন বাংলাদেশের ধর্ষকেরাও বুঝে গেছে তাদের কোনো বিচার হবে না। বিচারপ্রক্রিয়া পড়ে যাবে দীর্ঘসূত্রতায় আর ধর্ষিতার পরিবারটি অনিশ্চয়তায়। এই চক্র থেকে আমরা আদৌ কি বের হতে পারবো? রাষ্ট্রের সাথে এই ব্যার্থতা আমাদেরও। কারণ, আমরা নিজেদের মানিয়ে নিয়েছি সকল ‘অবৈধ’ প্রক্রিয়ায়। 

আচ্ছা ঐ বাচ্চা মেয়েটার জায়গায় নিজেকে রেখে একটা ভাবুন তো! এর চাইতে বর্বর আর কী হতে পারতো আপনার সাথে? এইটুক পড়ে হয়তো কিছুটা মানবিক হয়ে উঠবে হৃদয়। চোখ ছল ছল করবে জলে। তারপর? কিছুক্ষণ ভেজাবো টিস্যু, ফের খুঁজবো নতুন কোনো ইস্যু, এভাবে চলবেই...

আমরা আসলে এই সোশ্যাল মিডিয়ায় জীবনে পুরোপুরি বন্দী, আমাদের অস্তিত্ব বিলীন হ্যাশট্যাগে, একেকজন হয়ে গেছি ইস্যু বেইজড লিভিং ফর্ম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এদেশে গড়ে ৩ থেকে ৫টা ধর্ষণ হচ্ছে প্রতিদিন। কয়টার খবর রাখি আমরা? কয়টার বিচার চাই? যে ইস্যুটা একটু ট্রেন্ডি হয় সেটায় গা ভাসাই, এরপর আবার সবই ভুলে যাই।

এইতো কিছুদিন আগে বর্ণবাদের শিকার হয়ে জীবনটাই হারালেন আমেরিকার জর্জ ফ্লয়েড। নিষ্ঠুর পুলিশ অফিসারের হাঁটুর চাপে তিনিও শ্বাসরোধ হয়ে চলে গেলেন। মৃত্যুর আগে বারবার বলার চেষ্টা করছিলেন, আমি শ্বাস নিতে পারছি না... সে আকুতি বর্বর মানুষগুলোর কানে পৌঁছায়নি। তারপর? আমেরিকার সাথে যেন প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে পুরো বিশ্ব।

অথচ... অথচ... এই প্রতিবাদটা জানিয়ে আমরা নিজেরাই আবার বর্ণবাদমূলক আচরণ করবো। বিয়ের জন্য ফর্সা বউ খুঁজবো, কালো মানুষদের গায়ের রঙ নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করবো। কারণ আমরা যে ইস্যুভিত্তিক সিলেক্টিভ মানবতায় বন্দী। 

একজন বলিউড অভিনেতা মারা গেলেন। সেটাও বেশ বড়সড় ইস্যু হলো। ঘুরেফিরে একটা কথা খুব বাজেভাবে সামনে চলে আসলো- দুনিয়ায় এতো মানুষ মারা যাচ্ছে, তাতে কারো কোনো বিকার নেই। আর ঐ একজন মারা গেলো, তাতেই সবার ঘুম হারাম। আবার হিরামনির ঘটনাটা সমসাময়িক হওয়ায়, একটা তুলনা চলে আসলো। এটা নিয়ে কেউ কথা বলছে না, অথচ ওটা নিয়ে নিউজফিড ভেসে যাচ্ছে।  

এই ব্যাপারটা বুঝতে হবে 

এটা নিয়ে বলেছো, ওটা নিয়ে বলো নাই। কেন বলো নাই। আমরা আসলে এই ‘এটা ওটার’ সাময়িক মানবতাতেই বন্দী। ইস্যুটা ঘুরে গেলে এই হিরামনি, ঐ অভিনেতা সবাইকেই ভুলে যাবো। যেভাবে তনু-তৃষাদের ভুলে গেছি; দ্য লিস্ট গৌজ অন অ্যান্ড অন... 

আচ্ছা আমরা আসলে এমন কেন করি? যখন বিখ্যাত কেউ মারা যায় তখন তাকে ছাড়াও কিছু ভেবে উঠতে পারি না। যেই মানুষটাকে নিয়েই আমাদের এতো ভাবনা, সে হয়তো মারা যাওয়ার আগে কোটি মানুষকে 'মুগ্ধ' করে গেছে। কেউ সেই মুগ্ধতায় হেসেছে, কেউ কেঁদেছে। কেউবা দুর্বিষহ কোনো মুহূর্তে তৃপ্ত হয়েছে তার প্রতিভায়। এইযে মানুষটা নিজের জীবনীশক্তি দিয়ে এতোগুলো মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে গেলো, তার প্রস্থানের পর স্বাভাবিকভাবেই কি খারাপ লাগবে না?

নিজের অজান্তেই তখন বুকে চাপা কষ্ট অনুভূত হয়। দীর্ঘশ্বাস চলে আসে। মন খারাপের ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে যাত্রা শুরু করে। এমন এক নীরব হাহাকার শুরু হয়, যেন সেই মৃত্যুটা মানুষটাকে কেড়ে নিয়ে যাবার সময় সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের সত্ত্বার কোনো একটা অংশও সাথে করে টেনে ছিড়ে নিয়ে গেছে। ভেতরে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা পূরণ হতে খানিকটা সময় লেগে যায়। এই ব্যাপারটা একইসাথে কোটি মানুষের ভাবনায় ক্রমাগত আঘাত করে। যেটা আর দশটা মৃত্যুর সময় অনুভূত হয় না।

মানুষকে যতক্ষণ পর্যন্ত মনস্তাত্ত্বিকভাবে কেউ ছুঁতে না পারে, তার মরণের শোকও কাউকে ছোঁয় না। এ কারণেই কোটি মানুষ, কোটি মানুষের মৃত্যুতেও শোকহীন থাকে, অথচ ঐ একজনের মৃত্যুতেই আবার সেই কোটি মানুষ থমকে যায়। এভাবেই আমরা হয়ে উঠি সিলেক্টিভ। হীনম্মন্যতায় ভুগি। যে ইস্যুর সাথে নিজেকে কানেক্ট করাতে পারি, সেটাতেই মুখরিত হই। অথচ আমাদের হওয়ার কথা ছিলো আমির আজিজের কবিতার মতো। আমাদের বলা দরকার ছিলো—  

তোমরা কৌতুক লিখো, আমরা ইনসাফ লিখবো
বধিরও শুনবে এতো জোরে বলবো, অন্ধও পড়বে এতো সাফ লিখবো
তোমরা কালো পদ্ম লিখো, আমরা লাল গোলাপ লিখবো
তোমরা জমিনে জুলুম লিখো, আসমানে ইনকিলাব লিখা হবে
সব মনে রাখা হবে, সব মনে রাখা হবে 

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা