সামান্য শীত বাড়লেই আমরা গোসল করা বন্ধ করি, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেই! আর ওয়মিয়াকনে শীতকালে তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস সত্তর ডিগ্রিতে! মঙ্গলগ্রহের চেয়েও নাকি বেশি ঠান্ডা পড়ে সাইবেরিয়ার এই গ্রামে!

প্রতিবছর আমরা শুনি, সাইবেরিয়া থেকে অতিথি পাখিরা আসে আমাদের দেশে। আমরা তো নিজেদের দেশেই শীতের প্রবাহে কাতর, তাহলে কি এমন উষ্ণতার খোঁজে আসে ওরা? আমরা আয়োজন করে হাওরে যাই, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি পাখি দেখতে যাই, সাইবেরিয়া থেকে আগত পক্ষীকূল। আজকে একটু বরং ঘুরেই আসি, সাইবেরিয়ার একটি গ্রাম থেকে। যে গ্রামের নাম ওয়মিয়াকন। কতটা ঠান্ডা আসলে এই গ্রামটিতে আপনি বিশ্বাসও করতে পারবেন না৷ পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল গ্রাম বলা হয় এই গ্রামটিকে। যেখানে তাপমাত্রা কমতে কমতে গিয়ে ঠেকে মাইনাস একাত্তর ডিগ্রিতে। 

কীভাবে টিকে আছে এই গ্রামের মানুষ? সপ্তদশ শতক থেকেই সাইবেরিয়া রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল। এই অঞ্চলের একটি গ্রামের নাম ওয়মিয়াকন। রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় ৩৩০০ মাইল দূরবর্তী এই এলাকা। এটি পৃথিবীর মানুষের স্থায়ী বসতি থাকা সেই গ্রাম যেখানে সবচেয়ে বেশি ঠান্ডা পড়ে। এই ঠান্ডা কতটা বেশি বোঝাতে হলে কিছু ঘটনা শুনতে হবে আপনাকে। আপাতত একটা তথ্য দিয়ে শুরু করি। এই গ্রামের গড় তাপমাত্রাই মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। 

এখানে এতটাই ঠান্ডা যে, মঙ্গলগ্রহ থেকেও বেশি শীতল হয়ে যায় কোনো কোনো সময়, এই অঞ্চলটি। যেখানে মঙ্গলে তাপমাত্রা কম থাকার কারণে, মানুষের বসতি স্থাপন করার পরিকল্পনা এগুচ্ছে না। ইলন মাস্ক তো মঙ্গলের তাপমাত্রা বাড়ানোর জন্য পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের তত্ত্ব দিয়েছেন, এতটাই ঠান্ডা। আর আমাদের পৃথিবীতেই ওয়মিয়াকন নামে তারচেয়েও শীতল এক জায়গা আছে, যেখানে মানুষ বসবাস করছে! ভাবা যায়! 

এই অঞ্চলটি মঙ্গলগ্রহ থেকেও বেশি শীতল হয়ে যায় কোনো কোনো সময়

ওয়মিয়াকনে একবার মাইনাস ৭১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়। ১৯২৪ সালের কথা। এখানে কোনো ফসল টসল জন্মে না ঠান্ডার কারণে। এখানে লোকজনের প্রধান খাবার মাংস আর স্যুপ। বলগা হরিণ পালন করেন তারা, এর এই হরিণের মাংসই তাদের খাবারের উৎস। এখানে অবশ্য একটা সুবিধা, খাবার দাবার মানে মাছ মাংস ফ্রিজে রাখতে হয় না, পঁচে যাওয়ার ভয় নেই এই ভয়ংকর তাপমাত্রায়! 

গত বছর এখানে দুইজন মানুষ ঠান্ডায় জমে মারা গেছে। তাদের গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা গাড়ি থেকে নেমে বাকি পথ হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করে। আর তাতেই শেষ জীবন। এত ঠান্ডা যে, কিছুক্ষণের মধ্যে তারা বরফের মতো জমে নীল। এই অঞ্চলের গাড়ি চলন্ত অবস্থায় না থাকলেও বেশিরভাগ সময় ইঞ্জিন চালু করে রাখতে হয়। তা না হলে গাড়ি অকেজো হয়ে যায়৷ এখানে তাপমাত্রা মাইনাস পঞ্চাশ ডিগ্রির নিচে নেমে গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। এমনিতে অবশ্য খুব বেশি লোক এখানে বসবাস করেন না। সব মিলিয়ে পাঁচশ লোকের বাস এখানে। বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া এখানে বেশি বিড়ম্বনার। বরফের কারণে মানুষকে কোথাও শায়িত করা যায় না। সেক্ষেত্রে মৃতদেহ ভর্তি কফিন সমাধিস্থ করার আগে কবর খননের জন্য আগুন জ্বালিয়ে বরফযুক্ত মাটি কাটা হয়। আর এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত তিন দিন সময় লেগে যায়। 

বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া এখানে বেশি বিড়ম্বনার

এখানে ঠান্ডায় অদ্ভুত অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। যেমন- প্রচন্ড ঠান্ডায় কিছুক্ষণ থাকলেই চোখের উপরও বরফের আস্তরণ জমা হয়ে যায়। জানুয়ারিতে সবচেয়ে বেশি শীতল হয়ে যায় গোটা চরাচর। একবার তো ঠান্ডায় আবহাওয়াকেন্দ্রের থার্মোমিটারও বিকল হয়ে গেছে যখন, দেখা যায়, তাপমাত্রা নেমে গেছে মাইনাস ৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে! এছাড়া, কলমের কালি, গ্লাসে রাখা পানিও কিছুক্ষণ পর আর তরল থাকে না। জমে যায় একদম।

তবে ওয়মিয়াকন গ্রামের লোকজন বছরে কয়বার গোসল করেন এসম্পর্কিত কোনো তথ্য অবশ্য জানা সম্ভব হয়নি। তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় গোসল না করার ব্যাপারে গর্বিত সূচক পোষ্ট করেন কিনা তাও নিশ্চিত না। অবশ্য, কোনোদিন যদি তাপমাত্রা মাইনাস থেকে প্লাসে যায়, সেটা সম্ভব হবার কথা নয় যদিও, তবে সেদিন তো তাদের জন্য উৎসব হবে নিশ্চিত! তারা প্লাস এক ডিগ্রি তাপমাত্রা পেলে উদাম গায়ে ঘুরে বেড়াবে, উদ্দাম নৃত্যে উপভোগ করবে একটুখানি উষ্ণতা!

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা