আজকের জুমার নামাজসহ সকল নামাজের জন্য মসজিদ হতে বিরত থাকুন, অপ্রয়োজনে বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। যারা স্রষ্টায় বিশ্বাসী, তারা ঘরে বসেই স্রষ্টাকে ডাকুন।

শিরোনাম দেখেই নিশ্চয়ই ভ্রুকুটি কুঁচকে গেছে! 'নব্বই কিংবা তারও বেশি মুসলমানের দেশে কোন নাস্তিকের এত বড় দুঃসাহস' ভেবে গর্দান ফেলে দেওয়ার কথাও হয়তো ভাবছেন কেউ কেউ। দুঃখজনকভাবে লেখাটি যার, তিনি প্রবলভাবেই আস্তিক (না হলেও লেখার প্রাসঙ্গিকতা এতটুকু বদলায় না)। আরও দুঃখের ব্যাপার হলো, লেখাটির বিষয়বস্তু অত্যাধিক সহজ; এতটাই সহজ যে কাল-ক্ষণ বিবেচনা করলে যেকোনো বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের (আস্তিক কিংবা নাস্তিক) এই শিরোনামটি দেখেই এর হেতু বুঝে ফেলা উচিত। তবু না বুঝলে কী আর করার! চলুন মূল আলোচনায় চলে যাই।

করোনাভাইরাসের প্রকোপে গোটা বিশ্ব আজ থমকে গেছে। কীসে মিলবে মুক্তি, জানা নেই কারও। তবে কীভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যাবে, তার মিলেছে সদুত্তর। সেসবের মাঝে একটি- যতটা সম্ভব, লোকসমাগম এড়িয়ে চলা। বাংলাদেশ এখন অসম্ভবরকম করোনার ঝুঁকির মাঝে আছে। আজ শুক্রবার, ঐতিহাসিকভাবেই এদেশের মুসলমানদের 'অন্যান্য নামাজ না পড়লেও জুমার নামাজ পড়তেই হবে' মানসিকতা অটুট থাকছে। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন, স্রেফ ঈমানী জজবা দেখাতে গিয়ে কেন অজস্র মানুষের জীবন ঝুঁকির মাঝে ফেলবেন? সেই অধিকার কি আপনাকে কেউ দিয়েছে? স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও তো দেননি!

এইতো গত শুক্রবার কুয়েতের জুমার নামাজের কিছু আজান ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা গেছে "হাইয়া আলাল ফালাহ"-এর পরে বলা হচ্ছে "আসসালাতু ফি বুইয়ুতিকুম"। অর্থাৎ, 'তোমাদের বাড়িতে সালাত আদায় করো'। স্বাভাবিকভাবেই করোনাভাইরাসের কারণে প্রেক্ষাপট বাস্তবভিত্তিক হলেও এই ঘটনা প্রচণ্ড বিতর্কের জন্ম নেয়। তবে বিখ্যাত ইসলামিক স্কলার ডঃ ইয়াসির ক্বাদি তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে সুন্দর কিছু উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাপারটা চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। 

ইয়াসির ক্বাদির মতে, অন্য যেকোনো আইনের মতোই ইসলামি শরিয়তেরও প্রায় সব বিধানেরই ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছে। জামাতে সালাত আদায় করা ফরজ হলেও বিশেষ বিশেষ ব্যবস্থায় সেটারও ব্যতিক্রম ঘটতে পারে। যেমন প্লেগের সময় জামাতে সালাত আদায় স্থগিত করা যেতে পারে। এরপর নানান রেফারেন্স টেনে তিনি এর সপক্ষেও যুক্তি দেখিয়েছেন।

কিন্তু দিনশেষে বিদগ্ধ পাঠকদের অনেকেই হয়তো বলবেন, কোথাকার কোন 'ইসলামিক স্কলার'-এর কথায় আমরা বিশ্বাস করব কেন! আমরা অবশ্যই জুমার নামাজ পড়তে যাব! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, তিনটি সহিহ হাদিসের মাধ্যমে (খেয়াল করুন প্রিয় পাঠক, কোনো জাল হাদিস নয়, সহিহ হাদিস) সহজেই এটি প্রমাণিত সত্য, আজ মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং ঘরেই জোহর নামাজের চার রাকাত পড়লেই হবে। 

বিপদ বা দুর্যোগের সময় ঘরে বসে ইবাদত করা যাবে- এ কথা ইসলামই বলেছে

তিনটি সহিহ হাদিস আপনাদের জন্য তুলে ধরছি। 

১.
মুহাম্মাদ ইবনু সীরীনের চাচাতো ভাই 'আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস (রহঃ) কর্তৃক বর্ণিত,

একদা বৃষ্টির দিনে ইবনু 'আব্বাস (রা) তার মুয়াজ্জিনকে বললেন, 'আযানের মধ্যে তুমি যখন "আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসুলুল্লাহ" বলবে, তখন এরপর "হাইয়্যা আলাস-সালাহ" বলবে না। বরং বলবে, "সুল্লু ফি বুয়ুতিকুম" (তোমরা নিজ নিজ ঘরে সালাত আদায় করো)।' 

লোকেরা এটি অপছন্দ করলে 'আব্বাস (রা) বলেন, 'আমার চাইতেও উত্তম যিনি, তিনিও এমন করেছেন। নিঃসন্দেহে জুমা'র সালাত ওয়াজিব। কিন্তু এরুপ কাদা ও বৃষ্টির মাঝে তোমাদের হেঁটে আসতে (ঘর হতে বের হতে) আমি পছন্দ করি নাই।' [সুনানে আবু দাউদ (হাদিস নং ১০৬৬)]; হাদিসের মান: সহিহ।

২.
মহামারী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জুমার নামাজ ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জামাতে উপস্থিত হওয়া হারাম। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: لَا يُورِدُ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ "অসুস্থ পশুকে যেন সুস্থ পশুর মাঝে প্রবেশ করানো না হয়।" [বুখারী (৫৩২৮) ও মুসলিম (৪১১৭)]; হাদিসের মান: সহিহ।

তিনি আরও বলেন: إِذَا سَمِعْتُمْ بِالطَّاعُونِ بِأَرْضٍ فَلَا تَدْخُلُوهَا وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا فَلَا تَخْرُجُوا مِنْهَا “তোমরা কোন এলাকায় প্লেগ রোগের সংবাদ শুনলে সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোন এলাকায় তোমরা অবস্থান করার মধ্যে সেখানে প্লেগ রোগ শুরু হয়, তবে তোমরা সেখান থেকে বের হবে না।" [বুখারী ও মুসলিম]; হাদিসের মান: সহিহ।

৩.
বিশেষজ্ঞরা যার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তাকে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে, তার উপর ওয়াজিব হচ্ছে এ সিদ্ধান্ত মেনে চলা, নামাযের জামাতে ও জুমার নামাযে হাজির না হওয়া। নামাজগুলো নিজের বাসায় কিংবা তার কোয়ারেন্টাইনের স্থলে আদায় করা। যেহেতু আল-শারিদ বিন সুওয়াইদ আছ-ছাকাফি (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, "ছাকীফদের প্রতিনিধি দলে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত এক ব্যক্তি ছিল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে লোক পাঠিয়ে জানালেন যে, নিশ্চয়ই আমি আপনার বাইআত গ্রহণ করেছি; অতএব আপনি ফিরে যান।" [মুসলিম]; হাদিসের মান: সহিহ।

*

জেনে রাখুন, মহামারীর বিস্তার পুরোপুরি নির্ভর করে সামাজিক জমায়েতের ভিত্তিতে। আজকের জুমার নামাজসহ সকল নামাজের জন্য মসজিদ হতে বিরত থাকুন, অপ্রয়োজনে বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। যারা স্রষ্টায় বিশ্বাসী, তারা ঘরে বসেই স্রষ্টাকে ডাকুন। এত সব রেফারেন্সের পরও যদি কেউ জুমার নামাজে যান, পরকালে আল্লাহকে কী জবাব দেবেন?


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা