দেখলে মনে হবে, এ তো ভাজা মাছটাও উলটে খেতে জানে না। সেই চুপচাপ নির্লিপ্ত লোকটাই কিনা তেত্রিশটা মানুষকে খুন করেছে! রমন রাঘবের পরে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খুন করা সিরিয়াল কিলার এই খামরা!

তার নাম আদেশ খামরা। নামের মতো কাজও তার অদ্ভুত। অথচ তাকে দেখে মনেই হয় না লোকটা এরকম কিছু করতে পারে! মনে হয় এ তো ভাজা মাছটাও উলটে খেতে জানে না। এবং সে নিজেই জানিয়েছে- ছোটবেলা শান্তই থাকতো, অন্তর্মুখী স্বভাব, স্বল্পভাষী ছিল তখন। সেই চুপচাপ নির্লিপ্ত খামরা যে তেত্রিশটা খুনের আসামী দেখলে একদমই মনে হয় না। এই খামরা ভারতে ধরা পড়া কুখ্যাত এক সিরিয়াল কিলার। কিন্তু, কেন খামরা সিরিয়াল কিলার হতে গেল?

ধরা পড়ার পর নিজেই স্বীকারোক্তি দিয়েছে খামরা। ছোটবেলায় ভীষণ মুখচোরা ছিলো। তেমন কারো সাথে মিশতো না, স্বভাবটা অন্তর্মুখী। খামরা আশা করত সে সবার কাছ থেকে আলাদা একটা গুরুত্ব পাবে, সবাই তাকে ভালবাসবে। বিশেষ করে তার বাবা। কিন্ত খামরা দেখলো, তার বাবা তাকে সেই অর্থে ভালবাসে না। তার বয়সী অন্যান্য ছেলেরা বাবার কাছে যে আদর পায়, সে তা পাচ্ছে না। তার বাবা ছিলেন আর্মির নায়েবে সুবেদার। তাই সে ভদ্রলোক বাড়ির মধ্যেও কঠোর নিয়ম অনুশাসন জারি রাখতেন। খামরা ভুল টুল করে বসলেই তার পিতা তাকে শাস্তি দিতেন, প্রহার করতেন, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলতেন। খামরার মনে অভিমান হলো আর এই ধারণা জন্মালো যে কেউ তাকে কেয়ার করে না, কেউ তাকে ভালবাসে না। এই ধারণাটাই তার মানসিক জগৎকে ভীষণ ভাবে এলোমেলো করে দেয়। আদেশ খারমা বলেছিল, আমার ভেতরে এতো ক্ষোভ জমে জমে পাহাড় হয়ে গেছে যে আমি টেরই পাইনি কখনো আমি এমন মানুষ হয়ে গেলাম। 

২০০৭ সাল। আদেশ খারমা একটি গ্যাং এর সাথে পরিচিত হলো। এই গ্যাং এর কাজ হলো, বিভিন্ন ট্রাক লুট করা। খারমা ২০০৭ সালে প্রথমবারের মতো ট্রাক লুটের সাথে জড়িত হয়, কিন্তু সেবার সে কোনো খুন টুন করার কথা ভাবেনি। কারণ, এরকম গ্যাং-এ সে তখন একদমই নতুন। কিন্তু, তিন বছর এই লাইনে থেকে খামরা নিজেই হাইওয়ের জন্য একটা ডাকাত দল করে ফেললো। দিনের বেলা সে কাজ করতো এক দর্জির দোকানে। সাধারণ এক মানুষ। কাপড় সেলাই করে মানুষের জন্য বস্ত্র তৈরি করে। কিন্তু রাতের বেলায় খামরা হয়ে ওঠে বীভৎস। রাতের হাইওয়েতে ট্রাক টার্গেট করে সে।

কখনো হাইওয়ের পাশে খাবারের দোকানগুলোতে ট্রাকের ড্রাইভার হেল্পারদের সাথে সখ্যতা করে। প্রাথমিকভাবে তাদের সাথে গল্প জুড়ে দেয়, যে যেমন গল্প পছন্দ করে সেরকম কিছু। কখনো ট্রাক ড্রাইভারের কাছে অপ্রয়োজনীয় সাহায্য চায়, যেমন- সিগারেট আছে কি না, গ্যাসলাইট আছে কি না, মোবাইল ফোনের চার্জার আছে কি না এসব। যখন ট্রাক ড্রাইভার হেল্পারদের সাথে ভাল বন্ধুত্ব হয়ে যায়, তাদের মদ খাওয়ার প্রস্তাব করে, এভাবে সম্পর্ক সহজ হতে শুরু করে তখন খামরা তাদের উপর ড্রাগ প্রয়োগ করে। ড্রাগের প্রভাবে ধীরে ধীরে শীতল হয়ে যেতে শুরু করে ড্রাইভারের দেহ। আর তখনই তাকে খুন করে খামরা, আদিম বন্য হিংস্রতা তার চোখে মুখে খেলা করে তখন। তারপর লাশগুলোকে কালভার্টের নিচে কিংবা দূর্গম পাহাড়ের আড়ালে ফেলে খামরা ট্রাক এবং ট্রাকের ভেতরে থাকা সব রকম মালামাল বিক্রি করে দেয়। আর এই কাজটাই সে করে যাচ্ছিলো দিনের পর দিন।

পুলিশের হাতে আটক হবার পর খামরা

পুলিশের হাতে ধরা পড়া পর্যন্ত তার খুনের সংখ্যা তেত্রিশ! টাটা কোম্পানির ট্রাককেই বেশি টার্গেট করেছে খামরা, কারণ এর রিসেল ভ্যালু তুলনামূলক বেশি৷ ধরা পড়ার পর খারমা পুলিশের কাছে জবানবন্দিতে সব কিছুই স্বীকার করছে। তার মনে আছে প্রত্যেকটা খুনের গল্প, তার ভিক্টিমরা শেষবার কি আচরণ করেছিল, কি খাবার খেয়েছিল, কেমনতর যন্ত্রণায় ভুগে ভুগে মরে গেছে ওরা সবই মনে আছে খামরার। ধারণা করা হয়, খামরার কনফেশন, জবানবন্দি সঠিক যদি হয় তাহলে খুনের হিসাবে সে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খুন করা সিরিয়াল কিলার, প্রথমজন কুখ্যাত রমন রাঘব।

রমনের খুনের সংখ্যা ৪২। সে খুন গুলো করেছিল ষাটের দশকে, গ্রেফতার হয় ১৯৬৯ সালে। আর খামরা খুনগুলো করেছে গত অর্ধ যুগ ধরে। ধরা পড়লো এই মাসেই। খামরার বয়স ৪৮ বছর। ভোপালে একটা ছোট্ট দোকানে সে সেলাইয়ের কাজ করে। তার নিকটজন, এলাকার পরিচিতজন রীতিমতো তাকে ভদ্র, শান্ত, সুস্থির বলেই জানে। তারা ভাবতেও পারেনি খামরার মনের মধ্যে এতো কিছু! এখন তারা রীতিমতো শঙ্কিত এই ভেবে যে, এতোদিন খামরার আশেপাশেই তারা ছিল। যদি তাদের কিছু হয়ে যেত! 

খামরার তেত্রিশটি খুনের লাশ পাওয়া যেত মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গায়। কখনো উত্তরপ্রদেশে। কিন্তু যাদের লাশ পাওয়া যেত তারা সবাই হয় ড্রাইভার, নাহয় হেল্পার। পুলিশ এত দিন কুল কিনারা করতে পারেনি এই খুনগুলো,র ব্যাপারে। গত বছর ভোপাল শহরের এসপি, যিনি আবার তাইকোয়ান্দের ব্ল্যাকবেল্ট হোল্ডার, এশিয়ান গেমসের ব্রোঞ্জ পদক জয়ী, তিনি ধরে ফেললেন খামরাকে। আর তারপরই ফাঁস হয় তেত্রিশ খুনের এই উপাখ্যান। গত আগস্টের ১৫ তারিখ পুলিশ একটি মৃতদেহ উদ্ধার করে। লাশটি ছিল মাখন সিং নামে এক ট্রাক চালকের। তদন্তে জানা গেল, ওই ট্রাক চালক মান্ডিদীপ থেকে লোহা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। লাশ উদ্ধারের পরে ট্রাকটিকেও খুঁজে পাওয়া যায় হাইওয়ের পাশে। 

পুলিশ এই ঘটনায় এক ব্যাক্তিকে গ্রেপ্তার করে। জেরা করতেই সে কয়েকজনের নাম ধাম সব বলে দেয়। ধরা পড়ে একে একে নয়জন। যেই খুনগুলো রহস্য এতোদিন কূল কিনারা করা যায়নি সেগুলোই ধরা পড়ে গেল এভাবে, পুলিশ যদিও জানতো না তখনো এই চক্রই তেত্রিশ খুন করা দল। জেরার মুখেই সব বেরিয়ে আসে। তারা নিজেরাই স্বীকার করতে থাকে। পুলিশ মিলিয়ে দেখছে বর্ণনার সাথে, প্রত্যেকটা ঘটনাই সত্য।

কিন্তু, এই খামরার অনুপ্রেরণা কে? ২০১০ সালে ভারতে আরেকজন সিরিয়াল কিলারকে গ্রেপ্তার করা হয়। যার নাম অশোক খামরা। গ্রেপ্তারের পর অশোক ১০০ জন ট্রাক ড্রাইভারকে খুনের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। ধারণা করা হচ্ছে, খামরার অনুপ্রেরণা সেই ২০১০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া অশোক। কারণ, খামরা নিজেই খুন করা শুরু করেন ২০১০ সাল থেকে। সম্মিলিত দৌড়ের রিলে ব্যাটন হাতবদল হওয়ার মতো গল্প! একজন ছাড়ছে, আরেকজন ধরছে! কিন্তু, কেনো তারা এতোগুলো খুন করলো? পুলিশ প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেছে খামরার গ্যাং-কে। উত্তর কি এসেছেন জানেন? তারা বলছে, "ট্রাক ড্রাইভাররা কঠিন জীবনযাপন করে। দুঃখদুর্দশার শেষ নাই। আমরা তাদের মুক্তি দেই, তাদেরকে ব্যাথামুক্ত জীবনের পথ দেখাই।" কি অবস্থা! সিরিয়াল কিলাররাও আজকাল নিজেদের মানবতার ফেরিওয়ালা ভাবছে! 

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা