মরা এক সময় গুহায় থাকতাম, লতাপাতা গায়ে দিয়ে লজ্জা নিবারণ করতাম। যখন লতাপাতার বদলে লুঙ্গি-গামছার উদ্ভব হলো, তখন যদি কেউ বলত আমাদের হাজার বছরের লতা পাতা সংস্কৃতির বদলে এই আধুনিক পোশাকি সংস্কৃতি আমদানির নিন্দা জানাই, তখন কেমন লাগত?

আমি মানুষের পোশাকের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। একুশ শতকে এসেও যদি কেউ কারো পোশাকের ব্যাপারে ট্যাগ-ট্যাবু বসানোর চেষ্টা করে, আমি মনে করি সেটা অসভ্যতা। কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র মানুষের পোশাক ঠিক করে দেয়ার অধিকার রাখে না।

হ্যাঁ, কিছু কোড আছে, কিছু বাধ্যবাধকতা আছে, কিছু মোরাল কনসেপ্ট আছে। যেমন একজন ডাক্তার চাইলেই লুঙ্গি পরে অপারেশন থিয়েটারে যেতে পারবেন না, তাকে সার্জনের নির্ধারিত ড্রেস পরতেই হবে। একজন নারী যতই হিজাবি হোন না কেন, পরিচয় পত্র বা পাসপোর্টের ছবি তোলার সময় তাকে মুখ-কান খোলা রাখতে হবে, মসজিদের ইমামের পক্ষে থ্রি কোয়ার্টার পরে ইমামতি করা সম্ভব না যদি সেটা ‍নামাজের শর্ত পূরণ করেও, একটা মেয়ে যতই আধুনিক হোক, ধর্মীয় বিধি বা শেষকৃত্যের মতো অনুষ্ঠানে তার মাথায় কাপড় রাখা শোভনীয়, পোশাকের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে গার্লস হোস্টেলের সামনে শুধু আন্ডারওয়ার পরে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব...

এসব অত্যাবশকীয় বিধি নিষেধের বাইরে যাপিত জীবনে কে কী পোশাক পড়বে সেই সিদ্ধান্ত তাকেই দেয়া উচিত।

কুয়েটের শিক্ষার্থীরা এরাবিয়ান জোব্বা-পাগড়ী পরে র্যাগ ডে পালন করাকে কেন্দ্র করে কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি শুরু হয়ে গেছে যথারীতি। এক পক্ষ বলছেন, এটা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির সাথে যায় না। ভাই, বাঙালি সংস্কৃতি কি কংক্রিট কোনো ধারণা, যার পরিবর্তন-পরিমার্জন বা বিলুপ্তি নেই? কবে থেকে শুরু হলো বাঙালি সংস্কৃতি? ৫০০ বছর, হাজার বছর? আমাদের রুট তো গুহা সংস্কৃতি। আমরা এক সময় গুহায় থাকতাম, লতাপাতা গায়ে দিয়ে লজ্জা নিবারণ করতাম। যখন লতাপাতার বদলে লুঙ্গি-গামছার উদ্ভব হলো, তখন যদি কেউ বলত আমাদের হাজার বছরের লতা পাতা সংস্কৃতির বদলে এই আধুনিক পোশাকি সংস্কৃতি আমদানির নিন্দা জানাই, তখন কেমন লাগত?

কুয়েটের শিক্ষার্থীদের এই ড্রেসআপ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে

আমি জানি আপনি এখানে বলবেন এরাবিয়ান পোশাককে ডিফেন্ড করতে গিয়ে লতাপাতায় যাচ্ছি কেন? না ভাই, আমি আরবি পোশাকের কথা বলছি না। আমি কেবল সুবিধামতো সময়ে ব্যবহার করা "বাঙালি" ট্যাগটার ব্যাপারে আপত্তি জানাচ্ছি।

কুয়েটের এই ব্যাচের র্যাগ ডে টি শার্টের কোনো ছবি আমি দেখিনি। তারা যদি টি শার্টে অশ্রাব্য-অপাঠ্য অশ্লীল কথাবার্তা না লিখে ‍কেবল এই পোশাক পরে লাফালাফি করে তবে আমার মনে হয় তাদেরকে সাধুবাদ জানানো উচিত। রং ছিটিয়ে অনেকগুলো বস্ত্র ধ্বংস করে পাবলিক টয়লেটের দরজা-দেয়ালে যেসব কথা লেখা হয় সেগুলো র্যাগ ডের টি শার্টে লেখার যে সংস্কৃতি সেটা নিয়েই বরং সর্বাজ্ঞে আপত্তি জানানো উচিত।

দেশের একটা টিভি চ্যানেলের এই নিয়ে বিস্তর ঘাটাঘাটি করায় আমি হতাশ। সংবাদ মাধ্যমের আরো কাজ আছে। এই যে জেলায় জেলায় সদ্য নিয়োগ পাওয়া ডাক্তারদের মারধর করে হাসপাতাল ভাংচুর করা হচ্ছে সেটা নিয়ে কোনো একটা চ্যানেল উদ্যোগী হলে দেশ ও জাতির কিছুটা কল্যাণ সাধিত হতো।

আর ওপর পক্ষ, যারা প্রথম পক্ষকে ট্যাকল দিতে গিয়ে তাদের সুরেই তাল মেলাচ্ছেন...এরাবিয়ান পোশাক মানেই মুসলিম পোশাক এটা ভুল ধারণা। এরাবিয়ান নাস্তিকরাও তাদের এই পোশাক পরে। কুয়েটের র‍্যাগ ব্যাচে নিশ্চয়ই কিছু অমুসলিম ছাত্র ছিল...তাদের কিসের দায় পড়েছিল মুসলিমদের পোশাক প্রমোট করার? মেয়েরা তো বোরকা পরেনি, পড়েছে শাড়ি। সুতরাং দু পক্ষ মিলেই পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে যেভাবে ধর্মকে হাইলাইটস করছেন, সেটা ভুল।

আবারো বলি, আমি পোশাকের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। কোনো মেয়ে ওড়না না পরলেই আমি তাকে অশালীন ভাবি না, কেউ আপদমস্তক বোরকা গায়ে জড়ালে তাকে পশ্চাৎপদ মনে করি না, কারো স্যুট টাই-এ আমার সমস্যা নেই, সমস্যা নেই দাড়ি-টুপি-পাঞ্জাবিতেও।

আপনি যদি কাউকে পোশাকের ভিত্তিতে ফিল্টার করেন সেটা আপনার সমস্যা। আধুনিক পোশাকের কোনো মেয়ে দেখলে যদি আপনার সুড়সুড়ি লাগে, উচ্ছন্নে যাওয়া মনে হয়, টিজ করতে ইচ্ছে হয় তবে সমস্যাটা আপনার। বোরকা পরা কোনো মেয়ে বা পাঞ্জাবী পরা ছেলে দেখে প্রগতি ধ্বংস হয়ে গেল ভেবে যদি ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নেনে, তবে এই সমস্যাও আপনার নিজের।

ধর্ম বা সংস্কৃতি ধ্বংস বা রক্ষা দুইটাই নির্ভর করে মানুষের ওপর, মানুষের মন-স্বভাব এবং সততার ওপর। পোশাক স্রেফ কয়েক টুকরো কাপড়। পোশাক দিয়ে কিছু রক্ষা হয় না, কিছু বিলুপ্তও হয় না।

কারো যাপিত জীবনের পোশাক অপছন্দ হলে ইগ্নোর করুন। জোর গলায় হাউকাউ বা আপত্তি শুরু করলে চ্যাঞ্জ করুন, পোশাক না; নিজের সঙ্কীর্ণ মন।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা