কথার জবাব কথা দিয়ে দিতে হয়, সমালোচনার জবাব আলোচনায়, অভিযোগের জবাব দিতে হয় সেই অভিযোগকে খণ্ডন করে, নিজেকে নিরপরাধ হিসেবে প্রমাণ করে। কলমের বিরুদ্ধে লাঠি তুলে নিলেন মানে আপনি সেখানেই হেরে গেলেন...

ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে নোয়াখালী অভিমুখী লংমার্চে যাচ্ছিল ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবীতে আন্দোলনকারীদের একটা দল। প্রায় চারশো মানুষ ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিলেন। নারায়ণগঞ্জ এবং কুমিল্লা পেরিয়ে গতকাল রাতে তারা ফেনীতে পৌঁছেছেন, সেখানে আজ তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে, তাদেরকে পেটানো হয়েছে, রক্তাক্ত করা হয়েছে, তাদের বহনকারী বাসে ভাংচুর চালানো হয়েছে। হামলায় ছাত্র ইউনিয়নসহ বাম ছাত্রজোটের অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। হামলার শিকার হয়েছেন নারীরাও। আহতদের অভিযোগ, এই হামলা চালিয়েছে স্থানীয় ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের নেতাকর্মীরা। 

আন্দোলনকারীরা রাজনৈতিক শোডাউন করতে যায়নি, নিজেদের দলের প্রচারণা চালাতে যায়নি, তারা গিয়েছিল ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে, সচেতনতা তৈরি করতে। তাহলে কেন তাদের ওপর এই হামলা- এই প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যাচ্ছে না। বিবিসি বাংলায় ফেনী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদন সুশেন চন্দ্র শীলের বক্তব্য পড়লাম, তিনি বলেছেন- 

"আন্দোলনকারীরা যেখানে সমাবেশ করছিল (ফেনীর ট্রাংক রোড মোড়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে) তার কাছে স্থানীয় সাংসদ নিজাম হাজারির চারটি প্ল্যাকার্ড রয়েছে, যেগুলোতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি রয়েছে। তাদের সমাবেশের লোকজন ঐ প্ল্যাকার্ডগুলোতে লাল মার্কার দিয়ে 'ধর্ষকদের পাহারাদার', 'ধর্ষকদের গডফাদার', 'রেপিস্ট'-এর মত আপত্তিজনক কথা লিখেছে।"

সুশেন চন্দ্র শীলের বক্তব্য থেকে আমরা জানতে পারলাম, কেউ 'ধর্ষকের পাহারাদার' বলে কটুক্তি করলে তাকে ধরে বেদম মারতে হবে, লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালাতে হবে, নারী-পুরুষ বিভেদ করা যাবে না, পিটিয়ে রক্তাক্ত করে শুইয়ে ফেলতে হবে একদম। অথচ আমরা জানতাম, সভ্য সমাজে কথার জবাব কথা দিয়ে দেয়া হয়। কেউ কারো নিন্দা করলে, সমালোচনা করলে, সেটার জবাবে লাঠি তুলে নেয়াটা কোন ধরনের রাজনৈতিক শিষ্টাচার, সেটা আমাদের জানা নেই। বঙ্গবন্ধু অন্তত এই রাজনৈতিক চেতনা মনের ভেতর ধারন করেননি কখনও। তার হাতে গড়া দলটার নেতাকর্মীরা এখন ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যাকে তাকে পেটানোটাকেই মন্ত্র হিসেবে নিয়েছে।

পুলিশের সামনেই চালানো হয়েছে হামলা

অনলাইনে ভদ্রলোকের মুখোশ পরে থাকা অনেককে এই হামলাকে জাস্টিফাইও করতে দেখছি। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে কটুকথা বললে মার তো খেতেই হবে! না, এটা কোন সিস্টেম না, এটা পলিটিক্যাল এটিকেট না। কেউ আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে, আপনাকে ধর্ষকের পাহারাদার বলেছে, কারন আপনার দলের নেতাকর্মীরা এই অপরাধে জড়িয়েছে- তখন আপনারই দায়িত্ব নিজেকে প্রমাণ করার। দল থেকে ধর্ষকদের বের করার, তাদের জন্য কঠোর বার্তা দিয়ে সবাইকে জানানোর যে, এই ধর্ষকদের সাথে আমার বা আমার দলের কোন সম্পর্ক নেই, আমরা ধর্ষকদের পাহারাদার নই।

সেটা না করে আপনারা হামলা চালালেন। কলমের জবাব লাঠির মাধ্যমে দিলেন। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের বিচার চাইতে যারা ঢাকা থেকে ছুটে গেছে, তাদের আহত করলেন। আপনারা নিজেদের অবস্থান পরিস্কার তো করতে পারলেনই না, বরং আরও কালিমালিপ্ত করলেন নিজেদেরকে। আপনারা ক্ষমতায় আছেন, সহিষ্ণু হবার কথা ছিল, সেটা না হয়ে আপনারা হিংস্র হয়েছেন, উগ্র হয়েছেন। সেই উগ্রতার আগুনে পুড়েছে আন্দোলনকারীরা। 

সুশেন চন্দ্র শীল আরেকটা কথা বলেছেন, তিনি দাবী করেছেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগ কোন হামলা চালায়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির ছবিতে 'ধর্ষকের পাহারাদার' লেখায় স্থানীয় জনগনই নাকি লংমার্চে আসা আন্দোলনকারীদের মারধর করেছে। সুশেনবাবুর কাছে অনুরোধ, জনগন শব্দটাকে দয়া করে এত শক্তিশালী বানিয়ে দেবেন না। জনগন বড় দুর্বল, তারা হামলার শিকার হয়, তারা বাস চাপায় মরে, তারা ভবনে লাগা আগুনে পুড়ে যায়, তারা আততায়ীর হাতে খুন হয়, লাশ হয়ে বিদেশ থেকে ফিরে। দরকার হলে বলুন যে বিএনপি জামায়াত এই হামলা চালিয়েছে, তবু জনগনকে টানবেন না প্লিজ। 

আহত আঙুল

শেষ করার আগে ছোট্ট একটা ঘটনা বলি। ফ্রান্সে একটা ম্যাগাজিন আছে, শার্লি এব্দো। মহানবী (সা) কে নিয়ে কিছু বিতর্কিত কার্টুন ছেপেছিল তারা। ২০১৫ সালে দুই মুসলমান কট্টরপন্থী সেকারনে বন্দুক নিয়ে হামলা চালায় শার্লি এব্দোর সদর দপ্তরে। নিহত হন পত্রিকাটির সম্পাদক সহ অন্তত তেরোজন। গতকাল সেই কার্টুনগুলো নিয়ে এক ফ্রেঞ্চ শিক্ষক ক্লাসে আলোচনা করছিলেন, আরেক উগ্রবাদী মুসলমান ছাত্র তাকে সেখানেই খুন করেছে। 

এই যে হামলা বা হত্যাকান্ডের ঘটনাগুলো, ঈমানী জোশ দেখাতে গিয়ে যারা ঘটিয়েছে, তারা যে মুসলমানদের কত বড় ক্ষতিটা করলো, তারা নিজেরাও জানেনা। ফ্রান্স বা গোটা ইউরোপে এখন মুসলমানদের প্রতি যে পরিমাণ বিদ্বেষ, সেসবের পেছনে শার্লি এব্দো হামলার বড় একটা ভূমিকা আছে। গতকালের ঘটনাটা সেই বিদ্বেষ আরও বাড়াবে, বিপদে পড়বেন নিরীহ মুসলমানেরা। 

কথার জবাব কথা দিয়ে দিতে হয়, সমালোচনার জবাব আলোচনায়, অভিযোগের জবাব দিতে হয় সেই অভিযোগকে খণ্ডন করে, নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করে। কলমের বিরুদ্ধে আপনি লাঠি তুলে নিলেন মানে আপনি সেখানেই হেরে গেলেন। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস আপনার নেই, তাই হাতে তুলে নিয়েছেন অস্ত্র। যতোই আপনি অন্যকে পিটিয়ে তুলোধোনা করার আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন না কেন, আপনি যে নৈতিকভাবে দুর্বল, সেটা প্রকাশ হয়ে গেছে দুনিয়ার কাছে। ক্ষমতার অন্ধ অহংকার যে মানুষের নীতি-নৈতিকতা কেড়ে নেয়, সেটাই আরেকবার প্রমাণ করলেন আপনারা...

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা