সাংবাদিকদের সঙ্গে মাহফুজুর রহমানের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে সাগর-রুনি হত্যায় তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেই তিনিই আজ দেশের সংগীতসম্রাট। কারণ গণমাধ্যমও বুঝে গেছে, সাধারণ মানুষ এখন এগুলোই খাবে!

পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার প্রকোপে অন্য আরও অনেক জিনিসের মতো সংগীতও এখন আর কেবল শিল্পের বিশুদ্ধতম ধারাগুলোর একটি নয়। বরং এটিকে বাণিজ্যের মাধ্যম হিসেবে অভিহিত করাই হবে অধিক যুক্তিযুক্ত। তাই এই মুহূর্তে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী কে, এমন প্রশ্নের জবাবে, শ্রেষ্ঠত্ব বিচারে, গানটা কে সবচেয়ে ভালো গায়, তারচেয়ে কার গান মানুষ সবচেয়ে বেশি খায়, সেটিই হবে প্রধান বিবেচ্য। 

গান যখন নেহাতই খাদ্যদ্রব্য, তখন যেই রাঁধুনির গান বর্তমান বাংলাদেশে মানুষ সবচেয়ে বেশি গলধঃকরণ করছে, তিনি হলেন এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমান। ঠিক কীসের ভিত্তিতে তিনি নামের আগে 'ডক্টর' বসিয়েছেন তা আমরা জানি না। তবে গত দুই বছরের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আমরা দ্ব্যর্থহীন চিত্তে ঘোষণা দিতে পারি, তিনিই আমাদের প্রকৃত সংগীতসম্রাট। 

তো, সংগীতসম্রাট মাহফুজুর রহমান প্রথম একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ২০১৬ সালে 'হৃদয় ছুঁয়ে যায়' শীর্ষক একটি একক সংগীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে। সে অনুষ্ঠানটি এতটাই জনপ্রিয়তা পায় যে দেশের এক নম্বর সংগীতশিল্পীর তকমা বসে যায় তার নামের পাশে। এরপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ২০১৭-এর ঈদুল ফিতরে প্রচারিত হয় তার গান নিয়ে অনুষ্ঠান 'প্রিয়ারে'। একই বছর তার একক সংগীতানুষ্ঠান 'স্মৃতির আলপনা আঁকি' ব্যাপক আলোচিত হয়। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে গত বছরের দুইটি ঈদও ছিল মাহফুজুর রহমানময়। ঈদুল ফিতরে প্রচারিত হয় তার 'মনে পড়ে তোমায়', আর সর্বশেষ ঈদুল আজহায় 'বলো না তুমি কার'।

মাহফুজুর রহমান গায়ক হিসেবে কেমন, সে প্রসঙ্গে যেতে চাচ্ছি না। কারণ তার মাপের একজন সংগীতশিল্পীর গানের ব্যাপারে দুই-চার লাইনে কিছু বলে দেয়া মুশকিল। তাতে অনেক কিছুই বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাছাড়া গবেষণা ব্যতীত তার গানের ভালো মন্দ নিয়ে মুখ খোলা ঝুঁকিপূর্ণও বটে। বরং আমরা অপেক্ষায় থাকতে পারি, কয়েক বছরের মধ্যেই কেউ না কেউ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তার গানের উপর গবেষণা করবেন, বিশ্বখ্যাত কোনো জার্নালে সেই গবেষণা-প্রবন্ধ প্রকাশ করবেন, এবং সেটির ভিত্তিতেই সেই গবেষকও নিজের নামের আগে 'ডক্টর' বসানোর যোগ্যতা অর্জন করবেন।

তবে স্বয়ং ড. মাহফুজুর রহমানের কথার সূত্র ধরেই আপনাদের বলতে চাই, তিনি কিন্তু টাকার লোভে গান করেন না। বৈষয়িক কোনো মোহ থেকে তিনি গান করেন না। সংগীতের ব্যাপারে একান্ত ব্যক্তিগত ভালোলাগা থেকেই তিনি প্রথম একক সংগীতানুষ্ঠান করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে যখন তিনি টের পেলেন যে দেশের আপামর জনগণ মুখিয়ে থাকে তার গান শোনার জন্য, তখন থেকে এটি তার কাছে মূলত একটি সামাজিক দায়বদ্ধতাই হয়ে দাঁড়ায় যে অন্তত প্রতি ঈদে তার একটি করে গানের অনুষ্ঠান তৈরী করতেই হবে। শত ব্যস্ততার মাঝেও তাই তিনি দশ-বারোটি করে গান গেয়ে, স্টুডিওসহ দেশ ও দেশের বাইরে বিভিন্ন মনোরম লোকেশনে গিয়ে সে-সব গানের চিত্রায়ণ করেন। আর তার অনুষ্ঠান প্রচার করে এটিএন বাংলা প্রতি ঈদে বিজ্ঞাপন বাবদ কয়েক লক্ষ টাকা আয় করে।

অথচ বিস্ময়কর হলেও সত্য এই যে, তিনি এসবের বিনিময়ে একটি কানাকড়িও নিজের পকেটে পোরেন না। বাংলাদেশে টিআরপি ব্যবস্থা চালু নেই, তবু প্রতি ঈদে দর্শকের প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝে নিতে বিন্দুমাত্র কষ্ট হয় না যে তার অনুষ্ঠানই ঈদের এক নম্বর অনুষ্ঠান। শাকিব খান যদি হন বড় পর্দার সবচেয়ে বড় সুপারস্টার, তবে তিনি হলেন ছোট পর্দার সবচেয়ে বড় সুপারস্টার। শাকিব খানকে যদি বলা হয় 'কিং খান', তবে তাকে 'কিং রহমান' নামে ডাকা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। 

তাকে 'কিং রহমান' নামে ডাকা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব

আশি-নব্বইয়ের দশকের ঈদের আমেজের সাথে বর্তমান সময়ের ঈদের কোনো মিল খুঁজে পেতেন না বলে বছর দুই আগেও অনেককেই হাহাকার করতে দেখা যেত। বর্তমান প্রজন্মের মনেও একটা সূক্ষ্ম বেদনা টের পাওয়া যেত। কিন্তু সেসব এখন অতীত। ড. মাহফুজুর রহমানের গানের সুবাদে বিগত প্রজন্ম ফিরে পেয়েছে তাদের হারানো অতীতকে, আর তরুণ প্রজন্ম গর্বভরে বলতে পারছে, আমরা জন্মেছি সংগীতসম্রাট মাহফুজুর রহমানের উন্মেষকালে। 

ঈদ বলতে আপনি কী বোঝেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে আগে অনেকেই বলতেন, ঈদ হলো বছরের সেই সময়, যখন নাড়ির টানে শহর ছেড়ে গ্রামের পথে পা বাড়ায় মানুষ। কিন্তু এখন ঈদের সংজ্ঞা অনেকটাই বদলে গেছে। ঈদ বলতে এখন আমরা বুঝি সেই বিশেষ উপলক্ষ্যকে, যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যায় কেবল প্রিয় ও আপনজনদের সাথে একসাথে বসে ড. মাহফুজুর রহমানের সংগীতসুধা উপভোগ করার উদ্দেশে। 

তারপরও দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আমাদের দেশের মানুষ গুণীর কদর করতে জানে না। সবকিছুতেই মজা নেয়া তাদের স্বভাব। তাই তো ঈদ এলে তাদের জন্য ফেসবুকে মাহফুজুর রহমানের গান নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক স্ট্যাটাস দেয়া এক প্রকার ফরজ কাজে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক কুরবানির ঈদেও যেমন, ড. মাহফুজুর রহমানকে খাটো করে স্ট্যাটাস দেয়ার আগে অনেকেরই গরুর গোশত হজম হয়নি। এইসব মানুষেরা ভুলে যায় যে ফেসবুকে বিশেষ মানুষটিকে নিয়ে একের পর এক স্ট্যাটাস দেয়ার মাধ্যমে তারা নিজেই প্রশস্ত করে দিচ্ছে তার সফলতার পথ।

এবং তাদের স্ট্যাটাসের ভাষা দেখে সহজেই বুঝে নেয়া যায়, দেশের টেলিভিশন ইতিহাসে এই মানুষটির অবদান সম্পর্কে হয় তারা অবগত নয়, কিংবা যদিও বা অবগত হয়ে থাকে, কিন্তু এতদিনে তা তারা বিস্মৃত হয়ে গেছে। তারা বিস্মৃত হয়েছে (কিংবা জানেই না) যে, ৬৯ বছর বয়সী চির যৌবনের অধিকারী এই মানুষটি ১৯৭৮ সালে তার ব্যবসায়িক জীবন শুরু করেন। বাংলাদেশ থেকে নীট পোশাক ইওরোপে রপ্তানীর মধ্যে দিয়েই তার এই ব্যবসার শুরু। এরপর '৯৫ সালে এই ব্যবসার খাতিরেই ভারতের মুম্বাই শহরে গিয়ে জি-টিভির কার্যক্রম দেখে তার ইচ্ছা হয় ওই আদলে বাংলাদেশে একটি স্যাটেলাইট টেলিভিশনের প্রচার শুরু করার। সেই ইচ্ছা থেকেই সেসময়ে মুম্বাই এর একটি চ্যানেল এটিএন-এর এক ঘন্টা সময় ভাড়া নিয়ে অনুষ্ঠান বানানো শুরু হয় এটিএন বাংলার।

একসময় মুম্বাইয়ে এই চ্যানেলটি বন্ধ হয়ে গেলে মাহফুজুর রহমান চেষ্টা শুরু করেন পূর্ণাঙ্গভাবে একটি ২৪ ঘন্টার চ্যানেল শুরু করতে। থাইল্যান্ডের একটি স্যাটেলাইট ভাড়া নিয়ে, প্রতিদিন কুরিয়ার সার্ভিসে অনুষ্ঠানের টেপ পাঠিয়ে এসময় কার্যক্রম চালায় এটিএন বাংলা। এসময়ে এটিএনএর অনুষ্ঠান এবং বিজ্ঞাপনের মান নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনা ছিল; এর উত্তরে মাহফুজুর রহমান বলেন, অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়। অর্থাৎ সেসময় কোন বিজ্ঞাপন পাওয়া যেত না বলে বিটিভি যে সিগারেটের বিজ্ঞাপন নিত না তাই তারা লুফে নিতেন। আবার বাজেট কম থাকার কারণে তাদের অনুষ্ঠানের মানও ভাল ছিল না। তবে সংবাদ প্রচার করার অনুমতি পাওয়ার পরপরই তার চ্যানেলের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। 

আরও একটি অনুষ্ঠানের কারণে তার চ্যানেলটির জনপ্রিয়তা বাড়তে বাড়তে একেবারে আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। সেই অনুষ্ঠানটির নাম হলো 'সাবাশ বাংলাদেশ'। মাহি বি চৌধুরী ছিলেন সেই অনুষ্ঠানের নির্মাতা, আর উপস্থাপনায় ছিলেন অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ২০০১ সালের অক্টোবরে প্রচারিত অনুষ্ঠানটি ব্যবহৃত হয়েছিল সে-বছরের নির্বাচনে বিএনপির প্রচারণা হিসেবে। সেই অনুষ্ঠান সবাই দেখেছে। দেখেছে কী ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক উস্কানি ছাড়ানো হয়েছিল মাহির 'সাবাশ বাংলাদেশ' থেকে। এক হাতে কোরান আর এক হাতে গীতা নিয়ে বলা হয়েছিল, আপনি কি কোরানের শাসন চান নাকি গীতার শাসন চান? মাহির 'সাবাশ বাংলাদেশ' অসংখ্য সংখ্যালঘুর ঘুম হারাম করে দিয়েছিল সেদিন। এবং উস্কে দিয়েছিল সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠিকে, যার প্রমাণ পাই আমরা ২০০১ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা থেকে। 

'সাবাশ বাংলাদেশ' অনুষ্ঠানের নির্মাতা ছিলেন মাহি বি চৌধুরী

এই মহামানব, তথা ড. মাহফুজুর রহমান, নারীদের প্রতিও সবসময় দারুণ শ্রদ্ধাশীল। নারী উন্নয়নে তার যে কী ভীষণ অবদান, তার প্রমাণ আমরা পাই জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী ইভা রহমানের অবিশ্বাস্য উত্থানের মাধ্যমে। তাকে বিয়ে করার পরই ভাগ্য খুলে যায় ইভা রহমানের। একের পর এক অ্যালবাম বের হতে থাকে তার। এটিএন বাংলা চালু করলেও সারাদিন দেখা যেতে থাকে তাকে। কী না কিং রহমান করেছেন তার স্ত্রীকে স্বাবলম্বী হয়ে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করা জন্য! তাই তো পরবর্তীতে তিনি নিজের মুখেই বলেন, "বস্তির মেয়ে, আমি তাকে উঠিয়ে এনে স্টার বানাইয়েছি।" 

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম বরাবরই খুবই হিংসুটে। কারও ভালো সহ্য হয় না তাদের। কেউ একজন নিজ যোগ্যতায় সাফল্যের সিঁড়ি বের উপরে উঠতে শুরু করলে, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম দেখানো শুরু করে তার খেল। যেনতেন উপায়ে সেই মানুষটিকে টেনে হিঁচড়ে নিচে নামাতে চেষ্টার কোনো কমতিই তারা করে না। ড. মাহফুজুর রহমানের মতো একজন মানুষও রেহাই পায়নি তাদের হাত থেকে।

এবার আপনাদের সামনে পেশ করব সেই আখ্যান। মাত্র ছয় বছর আগে, ২০১২ সালে সাংবাদিকরা 'অবাঞ্ছিত' ঘোষণা করেছিলেন ড. মাহফুজুর রহমানকে। এমনকি তার গ্রেপ্তারের দাবিও উঠেছিল। বিপরীতে মাহফুজুর রহমান সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলাও করেছিলেন। তার প্রতিষ্ঠান এটিএন বাংলার কর্মীরা সাংবাদিকদের ওপর হামলাও চালিয়েছিল। এর প্রতিবাদে সাংবাদিক নেতারা ঘোষণা দিয়েছিলেন 'মাহফুজুর রহমান গণমাধ্যমের শত্রু'। এমনকি ২২ জুন, ২০১৪ তারিখেও মাহফুজুর রহমানকে প্যারিসের একটি মঞ্চে উঠতে দেয়নি সংক্ষুব্ধরা। এসময় ড. মাহফুজুর রহমানকে জুতা নিক্ষেপ করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশের সহায়তায় তিনি ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। 

সাংবাদিকদের সঙ্গে মাহফুজুর রহমানের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে সাগর-রুনি হত্যায় তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার মধ্য দিয়ে। নিহত মেহেরুন রুনী এটিএন বাংলাতে কাজ করতেন। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ নিয়ে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে ১১ এপ্রিল, ২০১৫ দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত এক খবরে জানানো হয়- মাকসুদুর রহমান রঞ্জু। এটিএন বাংলার একজন পরিচালক। তিনি এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমানের ছোট ভাই। পেশায় একজন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী যেদিন খুন হন সেদিনই তিনি দেশ ত্যাগ করেন।...

র‌্যাবের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে এমন সন্দেহভাজন আসামিদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাই তাকে তারা গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেয়। তদন্ত তদারকির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পুলিশের অন্য এক পদস্থ কর্মকর্তাও বলেন, "শুরু থেকে রঞ্জু তাদের সন্দেহের তালিকায় ছিলেন।" হত্যাকান্ডের ঘটনার পরপরই যখন মাহফুজুর রহমানের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল ওঠে, তখন তিনি ৩০ মে, ২০১২ লন্ডনে সাগর-রুনি হত্যার ব্যাপারে বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন। তার ওই বক্তব্য দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। ভিডিও ফুটেজ থেকে স্পষ্ট দেখা যায়, সেদিন প্রথমে তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে এ নিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন এবং দ্বিতীয় অংশে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও কিছু কথা যোগ করেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে মাহফুজুর রহমানের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে সাগর-রুনি হত্যায় তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার মধ্য দিয়ে

পরবর্তীতে স্যাটেলাইট চ্যানেল একুশে টিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'একুশের চোখ'-এ তার ওই বক্তব্যের সম্পূর্ণ ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করা হয়। সেখান থেকে মাহফুজুর রহমানের সেদিনের বক্তব্যের চুম্বক অংশ:

"সন্ধ্যা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত ডিউটি ছিল। এমন কী ঘটনা হলো, সবকিছু ফালাইয়া দিয়া, কাজ ফালাইয়া দিয়া সে রাত দুইটার সময় ফট করে বাড়িতে আসল। এটা কিন্তু সবারই প্রশ্ন যে এমন কী ঘটনার সে আলামত পাইছিল যে তার অফিসে কাউরে না জানাইয়া ফট করে রাত দুইটার সময় বাসায় গেছে। হয়তো বাসায় যাওয়ার পরে এমন কিছু দেখছে, দেখার পরে সে সহ্য করতে পারে নাই। তার ওই বাচ্চার কথায় আমার আসতে হয় যে, আমার আম্মুকে আমার আব্বু প্রথমে খুন করছে। তারপরে দুইটা গুন্ডা আমার আব্বুর হাত পা বেঁধে আমার আব্বুকে খুন করছে। "যে অস্ত্র দিয়ে মারা হইছে, বটির মধ্যে ওদের (সাগর-রুনির) হাতের ছাপ ছিল। পুলিশ যে ফিঙ্গার প্রিন্ট যেটা পাইছে, সেটা ওদের হাত ছিল। তো যদি অন্য কেউ, থার্ড পার্টি যদি মারে, তাইলে বটির মধ্যে ওদের হাতের ছাপ থাকবে কেন? "রুনির যে লাশটার যদি আপনারা ছবি দেখছেন কিনা জানি না, প্রথমদিন ছবিটা যেটা আমরা আবছাভাবে দেখাইছিলাম, ওর ভুড়িটা তেছরা করে কেটে ফেলা হইছে। ভুড়ির নাড়িভুড়ি সব বাইর হইয়া গেছিল। চাক্কুর মাইর কিন্তু, চাক্কু দিয়া যদি খুন করা হয় চাক্কু কিন্তু এইভাবে (হাত দিয়ে সোজা ছুরি ঢুকানোর ইশারা) স্টেব করে। চাক্কু দিয়া ওই নাড়িভুড়ি বাইর হইয়া আসে না। তাতে এটা বোঝা যাচ্ছে, বটি অথবা ওই গ্রামের বাড়িতে মুরগি, তরকারি কাটার যে চাক্কু দিয়ে এরকম (হাত দিয়ে তেছরা করে কোপ দেয়ার ইশারা) কোপ মেরে কাটা।"

বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাহফুজুর রহমান আরও বলেন: "ওদের বাসায়, যেটা আমি পরবর্তীতে জানতে পারলাম, অনেকেই যাতায়াত করত। অনেকেই যাতায়াত করত। কিন্তু এখন কেউই সেইটা প্রকাশ করতেছে না কে কে যেত। কারণ যদি কেউ প্রকাশ করে, কোনো সাংবাদিক যদি প্রকাশ করে আমি যেতাম, তাহলে কিন্তু কিছুটা দোষ তার ঘাড়ে এসে পড়বে। সেইজন্য অনেকেই প্রকাশ করতেছে না। কিন্তু তার বাসায় অনেক সাংবাদিকরাই যেত। রেগুলার যেত তার বাসায়। তার বাসায় এরকম নাকি শোনা গেছে, মদ খাওয়ার আড্ডাও চলত। বিভিন্ন সাংবাদিকরা তার বাসায় যাইয়া মদ টদ খেত। "আমরা যেটা, আমি যেটা, ধারণা করতেছি, বাচ্চা কখনও মিথ্যা কথা বলে না। একটি বাচ্চা কখনও মিথ্যা কথা বলে না। কারণ বাচ্চাটা, অতটুক একটা বাচ্চা, সে স্বচোক্ষে যেটা দেখছে, তার প্রথম কথাই ছিল, প্রথম ইন্টারভিউতে সে বলছিল, প্রথমে আমার আব্বু আমার আম্মুকে খুন করে। তারপরে দুইটা গুন্ডা তার বাবা-মাকে মারে। এটা প্রথম তার কথা ছিল। তার পরবর্তীকালেই সে আবার নেক্সট ডিবির একটা লোক যখন প্রশ্ন করছে তখন সে আবার আমতা আমতা উল্টাপুল্টা আবার বলছে। "যারা প্রফেশনাল কিলার, তারা কিন্তু কেউ ওইভাবে খুন করবে না, বটি দিয়ে খুন করবে না। তারা চাক্কু মারলেও তাদের চাক্কু মারার স্টাইলটাই অন্য। আর তারা গুলি ইউজ করবে, তাদের হাতে নাকি পিস্তল ছিল। তারা পিস্তল ইউজ করল না কেন? তারা বটি বা চাক্কু দিয়ে কেন মারল?" 

পরবর্তীতে অবশ্য সাংবাদিকরা জোর তদন্ত চালান, কিন্তু ড. মাহফুজুর রহমানের কথার কোনো সত্যতা তারা খুঁজে পাননি। কিন্তু তাতে কী! সব সত্যের কি প্রমাণ লাগে নাকি! এই যে তারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হচ্ছে, আপনার-আমার ঘরের বাতি জ্বলছে, পাখা চলছে, আমরা কি নিজের চোখে সেই বিদ্যুৎ কোনোদিনও দেখেছি? দেখিনি। কিন্তু তারপরও আমরা বিশ্বাস করি বিদ্যুতের উপস্থিতি সম্পর্কে। অনুরূপভাবে আমাদের বিশ্বাস করা উচিৎ ড. মাহফুজুর রহমানের প্রতিটি কথাও। কিন্তু তা না করে এক শ্রেণীর সাংবাদিক গিয়েছিলেন তার কথার সত্যতা যাচাই করতে। কত বড় আস্পর্ধা তাদের! কিন্তু সে যাইহোক, এক কালে ড. মাহফুজুর রহমানের নামে বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে। তাকে জেলের ঘানি টানাবার হীন চেষ্টা চালিয়েছে অনেকে, বিশেষত সাংবাদিকেরা।

কিন্তু আজ সেই ড. মাহফুজুর রহমানই দেশের সংগীতসম্রাট। তার সুরের মূর্ছনায় দোলে দেশের লক্ষ-কোটি দর্শকশ্রোতার হৃদয়। আর যেই সাংবাদিকেরা এক সময় তার নামে কুৎসা রটিয়েছিলেং, সেই তারাই আজ ফলাও করে পত্রিকায় প্রকাশ করেন ড. মাহফুজুর রহমানের একক সংগীতানুষ্ঠানের খবর। কারণ তারাও আজ জেনে গেছেন, সাধারণ মানুষ এখন ওগুলোই খাবে! 

ড. মাহফুজুর রহমানকে নিয়ে লিখতে লিখতে কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম। তাকে নিয়ে আরও লিখতে পারি। এক পৃথিবী লিখতে পারি। তবু তাকে নিয়ে লিখবার মতো কথা কখনও ফুরোবে না। তারপরও আজ এখানেই থামছি। পরে অন্য কোনোদিন না-হয় তাকে নিয়ে জমিয়ে আলাপ করা যাবে আরও। আজ শুধু এটুকু বলেই বিদায় নিতে চাই, ড. মাহফুজুর রহমানের মতো অলরাউন্ডার রয়েছেন বলেই বাংলাদেশটা এখনও বাসযোগ্য রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে, হৃদয় আর্দ্র ও অভিভূত করতে তিনি প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতেও হয়ত তিনি সে-চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। দেশের মানুষের প্রতি যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তিনি দেখাচ্ছেন, আমরা কি কখনও তা ভুলতে পারি?


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা