আমার বয়স তখন খুব বেশি হলে নয়-দশ বছর, থাকি তখন শান্ত শহর নড়াইলে। সুলতানের শহর নড়াইল, মাশরাফির শহর নড়াইল, তারেক মাসুদের নড়াইল। তারেক মাসুদের নড়াইল কেন বলেছি সেই গল্প পরে করছি, আগে আমার নয়-দশে ফিরে যাই। ফিরে যাই এক শীতের রাতে। 

নড়াইল খুবই সংস্কৃতিমনা, অসম্প্রদায়িক একটি শহর। সুলতানের জন্মদিন হোক বা বৈশাখ, ঈদ হোক বা পূজা, নড়াইল জুড়েই উৎসব উৎসব ভাব একদম সারা বছর। এক শীতে নড়াইলে কোন এক উৎসবের মেলা চলছে। নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজের মাঠে সন্ধ্যা জুড়েই নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান যখন শেষের দিকে, তখন মঞ্চে ঘোষণা করা হলো সবাইকে রাতের খাবার শেষ করে আবার এই কলেজ মাঠে জড়ো হতে, কোন এক পরিচালক তার সিনেমা সবাইকে দেখাতে চান প্রজেক্টরে। সিনেমাটি নাকি পৃথিবীর নানা দেশে অনেক পুরস্কার পেয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের হলে এই সিনেমাটি নিষিদ্ধ, মুক্তি পায়নি কোথাও। 

নিষিদ্ধ সিনেমা শুনে অনেকের আগ্রহ বেড়ে গেলেও পারিবারিক মানুষরা খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বাচ্চাদের নিয়ে এই সিনেমা দেখা যাবে কি না এমন প্রশ্ন আমার মাকে শুনলাম কাকে যেন জিজ্ঞেস করছে। যাই হোক, বাড়ি ফিরে দ্রুত রাতের খাবার খেয়েই আমি এক দৌড়ে কলেজের মাঠে। আমার বাসা থেকে মাঠের দূরত্ব ১০ গজ, সুতরাং যাওয়া তো ফরজ। 

শীতের কুয়াশায় আমার জীবনে প্রথম দেখা হয় তারেক মাসুদের সাথে। লম্বা এক ভদ্রলোক, খুব সুন্দর করে হাসি দিয়ে সবাইকে ধন্যবাদ জানালেন সিনেমাটি দেখতে আসার জন্য। একটু পর দেখলাম আমার মা আমার ছোট ভাইকে নিয়ে হাজির হয়েছেন মাঠে। 'মাটির ময়না' শুরু হলো ঠিক মিনিট দশেক পর। আমার জীবনের অনেক ভালো স্মৃতি আছে, সিনেমার পোকা আমি ছোটবেলা থেকেই। তাই খারাপ বা ভালো হোক সিনেমা মানেই আমি একদম মনোযোগী ছাত্রী। তবে আমার ২০ বছরের জীবনে আমার সব থেকে মুগ্ধ হয়ে দেখা সিনেমার নাম 'মাটির ময়না'। 

'মাটির ময়না'র শিশুশিল্পীর সাথে তারেক মাসুদ

আনু আর তার বোনের খেলার দৃশ্য, ছেলের জন্য মায়ের কান্না, ছাত্র আন্দোলন, কঠোর বাবার কঠিন সিদ্ধান্ত, মাদ্রাসা জীবনের ভয়াবহ কষ্ট, নির্যাতন, আনু আর আনুর বন্ধু, রোকনের বন্ধুত্ব দেখে আমি কেঁদেছি, রোকনের জীবনের পরিণতি আমাকে ভয়ঙ্করভাবে প্রভাবিত করেছিল, সিনেমা যে কতখানি সুন্দর হতে পারে সেটাও এক শীতের রাতে আমার জানা হয়ে গিয়েছিল। ৯ বছরের একজন মানুষের জন্য মাটির ময়না কেবল একটি সিনেমা ছিল না, জীবনের একটা একদম অন্যরূপের সাথে পরিচয়ের হয়েছিল সেদিন। মাটির ময়না দেখে আমি প্রথম অনুভব করি স্বাধীনতার তৃষ্ণা। যুদ্ধ, ধর্ম, পরিবার আর জীবন নিয়ে যে অদ্ভুত গল্প তারেক মাসুদ এই সিনেমাতে বলেছেন, তা আমাকে এক পলকে অনেকখানি বড় করে দেয়। অবশ একটা অনুভূতি অনুভব করি যেটা এখনও আমাকে নাড়া দেয়।

তারেক মাসুদ বলেছিলেন তার নিজের জীবনের নানা ঘটনা এই সিনেমায় ব্যবহার করা হয়েছে। একটি ছোট্ট ছেলের জীবন কিছু সিদ্ধান্তে কতটা বদলে যায় তার এক অদ্ভুত গল্প মাটির ময়না। এরপর তারেক মাসুদের সাথে বেশ কয়েকবার দেখা হওয়ার সুযোগ মিলেছে। সিনেমা নিয়ে কথা বলতে তিনি অনেক ভালোবাসতেন। নড়াইলের প্রতি তার টান একদম ছাত্র বয়সে। টানটা যদিও নড়াইলের থেকে বেশি ছিল এস এম সুলতানের প্রতি, তাঁর প্রতি তারেক মাসুদের মুগ্ধতা একদম ছাত্র বয়স থেকে। দীর্ঘ তিন বছর তিনি আর ক্যাথরিন মাসুদ নড়াইলে থেকেছেন সুলতানের জীবনের নানা দিক নিয়ে কাজ করার জন্য। 'আদম সুরত' নামের তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন এস এম সুলতানের জীবন ও শিল্পকলার উপর। সিনেমা ছিল তার জীবন জুড়ে। 

ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানিয়ে প্রথম দিকে হাত পাঁকালেও জীবনের উদ্দেশ্য ছিল সিনেমাকে সব থেকে বড় শিল্প মাধ্যমে পরিণত করার। জীবনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমাতে হয়তো এ কারণেই একেবারে বাজিমাত। কান চলচ্চিত্র উৎসব থেকে অস্কারের আসর, মাটির ময়নার জয়গান ছিল সবখানে, অথচ বাংলাদেশী হিসাবে আমাদের দুর্ভাগ্য দেখুন, সিনেমাটি প্রথম জনম্মুখে আসে ২০০৬ সালে, তাও সিডি আর ডিভিডির মাধ্যমে! অস্কারের আসরে বাংলাদেশের প্রথম সংযোজন ‘মাটির ময়না’। সিনেমার ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র। অভিনেতা থেকে সেট, সংলাপ, প্রেক্ষাপট হোক বা সময় পরিভ্রমণ মাটির ময়না নিজেই একটি ফিল্ম স্কুল।

'মাটির ময়না' সিনেমার দৃশ্য

তারেক মাসুদ আজ পৃথিবীতে নেই। এই আফসোস আর দুর্ভাগ্যও আমাদের। তবে মানুষ যে তার সৃষ্টির সমান বড়, সেটি মাত্র ৫৪ বছর বয়সের জীবনে তারেক মাসুদ ছাড়িয়ে গিয়েছেন নিজেকেও। আমার জীবনের সেরা কিছু মুহূর্ত এই মানুষটি তার সৃষ্টির মাধ্যমে উপহার দিয়েছেন, স্বপ্ন দেখিয়েছেন ‘ভালো সিনেমা’ বানানোর। একজন শিল্পীর জীবনের সার্থকতা তার কাজে, তার স্বপ্নে। তারেক মাসুদ তাই স্বার্থক, তিনি শুধু সিনেমা বানাননি, বুনেছেন স্বপ্নের বীজও।

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা