পলকের বয়স গত পাঁচ মাসে বোধহয় পনেরো বছর বেড়ে গেছে। খাওয়ার ঠিক নেই, ঘুমানোর ঠিক নেই, বাবা বন্দী, মায়ের চাকরি নেই; তবু রাষ্ট্রযন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে এই তরুণ ক্ষমতাবানদের চোখে চোখ রেখে তার বাবার মুক্তি চাইছে- এ তো কম সাহসের কাজ নয়!

ছবিতে যে ছেলেটাকে দেখছেন, ওর নাম মনোরম পলক। আমার চেয়ে বেশ কয়েক বছরের ছোট হবে। আমি যখন ওর বয়সে ছিলাম, আমার দুনিয়াজুড়ে অদ্ভুত সব স্বপ্ন ছিল। আনন্দ ছিল, খুশি ছিল। পলকের সেসব কিছুই নেই। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তার বাবা সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল ৫৪ দিন নিখোঁজ ছিলেন, বেঁচে আছেন কি মরে গেছেন, সেটাও জানতো না পরিবার। মে মাসে পুলিশ জানায়, ভারত থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় কাজলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে তার নামে তিনটি থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আলাদা তিনটি মামলা হয়েছিল, গ্রেপ্তারের পরে বিজিবি তার নামে করেছে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা। তবে লকডাউনের মধ্যে কাজল ভারতে কিভাবে গেলেন, সেখান থেকে বাংলাদেশেই বা কিভাবে অনুপ্রবেশ করলেন- এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয়নি। 

মার্চের দশ তারিখে নিখোঁজ হওয়া থেকে আজ আগস্টের ত্রিশ তারিখ- কাজল কাটাচ্ছেন বন্দী এক জীবন। বিজিবির অনুপ্রবেশ মামলায় জামিন মিললেও, ৫৪ ধারায় করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় আদালত তাকে জামিন দেয়নি। কাজল বা তার পরিবার, কেউ জানেনা তার অপরাধটা আসলে কি ছিল। নিখোঁজ হবার আগে মানবজমিন পত্রিকায় প্রকাশিত একটা সংবাদ নিজের ফেসবুক একাউন্ট থেকে শেয়ার করেছিলেন কাজল। সেই খবরের শিরোনাম ছিল- 'পাপিয়ার মুখে আমলা, এমপি, ব্যবসায়ীসহ ৩০ জনের নাম'। মাগুরা-১ আসনের সাংসদ সাইফুজ্জামান শিখর সংবাদটিকে মিথ্যা দাবী করে মামলা করেছিলেন ৫৪ ধারায়। মানবজমিন সম্পাদকের পাশাপাশি কাজলকেও সেই মামলায় আসামী করা হয়েছিল। 

মজার ব্যাপার হচ্ছে, মানবজমিনের সম্পাদকও জামিনে আছেন, রিপোর্টারও জামিন পেয়েছেন। অথচ জেলখানায় বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন সেই সংবাদ ফেসবুকে শেয়ার করা কাজল। কাজল যেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে নিখোঁজ হলেন, সেদিন থেকেই পলকের মুখের হাসি হারিয়ে গেছে, সেখানে জায়গা করে নিয়েছে উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা, আর হতাশা। 

আদালতে হাতকড়া পরা বাবার পাশে পলক

পলকের বয়স কত হবে? একুশ-বাইশের বেশি না। ভার্সিটির থার্ড ইয়ারের ছাত্র সে মাত্র। বাবাকে ফেরত পাওয়ার জন্য বাচ্চা ছেলেটা সংবাদ সম্মেলন করেছিল, থানা-পুলিশের কাছে দৌড়েছে বারেবার। মে মাসে যখন পুলিশ জানালো যে কাজলের খোঁজ পাওয়া গেছে, করোনার লকডাউনের মধ্যে পলক মাইক্রো নিয়ে ছুটে গেছে যশোরে, বাবাকে একবার জড়িয়ে ধরবে বলে। হাতে হ্যান্ডকাফ পরে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় বাবাকে এতদিন পরে সামনে দেখেও পলক একটুও কাঁদেনি, সে কেঁদেছে ঢাকায় ফেরার পথে। ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছিল সেই রাতে, বৃষ্টির জলের সঙ্গে তার চোখের জলও মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। হৃদয়ভাঙা এই গল্পগুলো পলক নিজেই শেয়ার করেছে ফেসবুকে। 

জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হয়েছে, যশোর থেকে সাংবাদিক কাজলকে নিয়ে আসা হয়েছে কেরাণীগঞ্জে, অথচ পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে দেখা করতে পারেনি। রাষ্ট্রের টাকায় লুটেরা-যুদ্ধাপরাধীরা পিজি হাসপাতালে মাসের পর মাস চিকিৎসা নিচ্ছে, এদিকে অসুস্থ কাজলকে হাসপাতালে ভর্তি করতে বারবার বিলম্ব করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। এত আঘাত, এত যন্ত্রণা, তবুও পলক ভেঙে পড়েনি। সে শহীদ মিনারে দাঁড়িয়েছে বাবার মুক্তির দাবীতে, মানববন্ধনের আয়োজন করেছে, ফ্রি কাজল লেখা মাস্ক বানিয়েছে, সেই মাস্ক মুখে চাপিয়ে অংশ নিয়েছে মানববন্ধনে। একুশ বছরের ছেলেটা তার বাবার গ্রেফতারে ভীত না হয়ে আমাদের বার্তা দিয়েছে, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করে দেয়াটা এত সহজ নয়। 

মাঝখানে দুটো ঈদ পলকেরা কাটিয়েছে বাবাকে ছাড়া। ঘরে আনন্দ আসেনি, মুখের হাসি তো গায়েব হয়েছে অনেক আগে। সেই মলিন মুখ নিয়ে পলক তবু বাবার মুক্তির দাবীতে অনড়। এই ছেলের মেরুদণ্ডটা দেখলে আমি অবাক হই। পলকের জায়গায় আমি থাকলে কি করতাম? আদালতের বারান্দায় দৌড়াদৌড়ি, অমুক-তমুককে ধরা, মিডিয়ার অ্যাটেনশন পাওয়ার চেষ্টা, একদিন, দু'দিন, এক সপ্তাহ, এক মাস... তারপর? হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকতাম, কবে সরকার বাহাদুরের দয়া হবে, কবে তারা আমার বাবাকে ছাড়বে। 

বাবার মুক্তির জন্য অসম্ভবকে সম্ভব করার মিশনে নেমেছেন পলক

পলক আমার মতো ভীতু নয়, ছেলেটা লড়ছে, হাল ছাড়ার কোন লক্ষণ আমি ওর মধ্যে দেখতে পাই না। ‘আমার বাবা কাজলের মুক্তি চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে শহীদ মিনারে দাঁড়ানো পলকের ছবি দেখে আমার চোখ ভিজে ওঠে, আমি জানি, এই কাজ আমাকে দিয়ে কখনও হতো না। খাওয়ার ঠিক নেই, ঘুমানোর ঠিক নেই, বাবা বন্দী, মায়ের চাকরি নেই, বাসার মানুষগুলো একে অন্যের সাথে ঠিকমতো কথাও বলে না। কি বলবে, একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে থাকে শুধু, চোখে হাজারটা প্রশ্ন নিয়ে, যে প্রশ্নের উত্তর তাদের জানা নেই। তবুও পলক চেষ্টা করে যায়, ফেসবুকে ফ্রি কাজল হ্যাশট্যাগ চালু করার আহবান জানায়, সেলিব্রেটিদের সাথে কথা বলে, তাদের পাশে পাওয়া যাবে কিনা জানতে চায়, বেশিরভাগ সময় নিরাশ হতে হয়, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস যে খুব বেশি মানুষের নেই। 

আমি বিশ্বাস করি, একটা রাষ্ট্রের কখনও ফ্যাসিবাদী আচরণ করা উচিত নয়। কেউ অপরাধ করলে করতে পারে, কিন্ত রাষ্ট্র তাকে 'গুম' বা 'নিখোঁজ' করে রাখতে পারে না, নিকৃষ্ট অপরাধীর বেলায়ও না; তাহলে রাষ্ট্র আর অপরাধীর মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না। পাপিয়াকে নিয়ে প্রকাশিত নিয়ে সেই সংবাদটা যদি মিথ্যাই হয়, সেটা রাষ্ট্র আমাদের জানাক, সেই সংবাদ তৈরির সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনুক। কাজল সেই সংবাদের রিপোর্টার ছিলেন না, তথ্যদাতাও ছিলেন না, তিনি কেবল নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সেটা শেয়ার করেছিলেন। কাজল অপরাধী হলে এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ এই একই অপরাধে অপরাধী, প্রতিদিন অজস্র মানুষ এই অপরাধ করছে। সবাইকে গ্রেফতার করুন, রিমান্ডে নিন। কাজল একা কেন ভুক্তভোগী হবেন? 

পলক ছেলেটার বয়স গত পাঁচ মাসে বোধহয় পনেরো বছর বেড়ে গেছে। বাবা-মায়ের ছায়ার নীচে থাকা তরুণ আচমকা যেন পুরুষ হয়ে উঠেছে, যে পুরুষ মেরুদণ্ড সোজা রেখে লড়তে জানে। চারপাশে মানুষের চেহারা আর আকৃতি নিয়ে ঘোরাফেরা করা অ্যামিবার মতো মেরুদণ্ডহীন প্রাণীদের দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে আমি পলকের ফেসবুক প্রোফাইলে যাই, ওর ছবি, ওর অ্যাক্টিভিটি দেখি। গোটা একটা রাষ্ট্রযন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে এই ছেলেটা চোখে চোখ রেখে তার বাবার মুক্তি চাইছে- পলকের এই দুরন্ত সাহস থেকে খানিকটা ধার নিতে ইচ্ছে হয় আমার। 

পলক, ভালোবাসা নেবেন। আপনাকে দেয়ার মতো এটুকুই আছে আমাদের কাছে...

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা