পড়াশোনা শেষ করে চলে গিয়েছিলেন বিদেশে। সেখানের সেলিব্রেটি স্ট্যাটাস ছেড়েছুড়ে আবার দেশের টানেই ফিরে এসেছিলেন। ভাস্কর্য নির্মাণকে নিয়ে গিয়েছেন অন্য পর্যায়ে। ভাস্কর্যের জন্যে হয়েছেন প্রশংসিত, হয়েছেন তীব্র সমালোচিতও। বাংলাদেশে তাঁর মতো আলোচিত হননি আর কোনো ভাস্করই!

রাতের আঁধারে যখন সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে কিছু মানুষের আন্দোলনের মুখে নামিয়ে ফেলা হচ্ছে লেডি জাস্টিসিয়ার ভাস্কর্যটি, ভীড়ের মধ্যে আমরা লক্ষ্য করি এক উসকোখুসকো চুলের, হতবিহ্ববল মানুষকে। চোখেমুখে তাঁর স্পষ্ট হতাশা। কথা বলে জানা গেলো, তিনি এই সরিয়ে নেয়া ভাস্কর্যের স্থপতি। যিনি কান্না চাপতে চাপতেই বললেন, 'ভাস্কর্য অপসারণে আমার আসার দরকার ছিলো না। কিন্তু ওরা যেন নামানোর সময় ভেঙ্গে না ফেলে, ধাক্কা-টাক্কা না দিয়ে ফেলে, সেটার জন্যেই আমি এসেছি।'

প্রত্যেক শিল্পীর কাছেই তাঁর নির্মাণ সন্তানের মতন। কোথায় যেন ভেতরে ভেতরে মমতাও থেকে যায় এই সন্তানগুলোর জন্যে। সেই অপত্যস্নেহই লক্ষ্য করি আমরা এখানে।

এই আলোচিত ভাস্কর্যের ভাস্কর মৃণাল হক। যিনি প্রয়াত হয়েছেন আজ। অবশ্য এ প্রয়াণ সাময়িক,  ঢাকাসহ সারাদেশে তাঁর নির্মিত অজস্র ভাস্কর্য সরব হয়ে তাঁর অস্তিত্বের প্রতিনিধি হিসেবে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে, সামনেও থাকবে নিঃসন্দেহে। ভাস্কর্যের কনসেপ্টও যখন এদেশে ঠিকঠাক গড়ে ওঠেনি, এ মানুষটি দায়িত্ব নিয়ে নির্মাণ করেছেন একের পর এক ভাস্কর্য। যিনি আলোচিত, সমালোচিত, বিতর্কিত হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ভাস্কর্যের জন্যে। কিন্তু দমেননি মোটেও। এক মনে নিজের কাজই করে গিয়েছেন শেষপর্যন্ত।

মৃণাল হকের জন্ম রাজশাহীতে, যুদ্ধের আগে। পড়াশোনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটে। এখান থেকেই মাস্টার্স সম্পন্ন করে ১৯৯৫ সালের দিকে তিনি চলে যান আমেরিকা। আমেরিকার নিউইয়র্কে তিনি তাঁর কাজ পুরোদমে শুরু করেন। নিউইয়র্ক সিটির বাংলাদেশি দুতাবাসে তার শিল্পকর্মের প্রদর্শনী হয়। তিনি সেখানে এত অজস্র কাজ করেছেন যে, মিডিয়ার খুবই পরিচিত মুখ হয়ে যান। কিন্তু কোথায় যেন দেশের জন্যে টান থেকে যায়। সব ছেড়েছুড়ে ফিরে আসেন বাংলাদেশে।

সাত বছর প্রবাসে থাকার পর ২০০২ সালে দেশে ফিরেই তিনি ভাস্কর্য নির্মানে মনোযোগ দেন। মতিঝিলের বক ভাস্কর্যটি নিজ উদ্যোগেই নির্মাণ করেন। এছাড়াও পুরো ঢাকা শহরে নির্মাণ করেন ২৫টিরও বেশি ভাস্কর্য। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে ‘রত্নদ্বীপ’, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে ‘রাজসিক’, পরীবাগ মোড়ে ‘জননী ও গর্বিত বর্ণমালা’, সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ের ভাস্কর্য, বঙ্গবাজারে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, ইস্কাটনে ‘কোতোয়াল, সাতরাস্তায় ‘বর্ষারাণী’, মতিঝিলের ‘বক, নৌ সদর দফতরের সামনে ‘অতলান্তিকে বসতি' সহ নানা রকম এক্সপেরিমেন্টাল কাজও করেন মৃণাল হক  এছাড়াও ২০০৩ সালে জন্মস্থান রাজশাহীতে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে 'গোল্ডেন জুবিলী টাওয়ার' নির্মাণ করেন তিনি।

অসাধারণ সব ভাস্কর্যের জন্যে যেমন তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। কিছু ভাস্কর্যের জন্যে বেশ ভালোরকমই সমালোচিতও হয়েছেন তিনি। 'লেডি জাস্টিস' ভাস্কর্য নিয়ে তো রীতিমতো তুলকালামই হয়েছে। ২০০৮ সালের দিকে বিমানবন্দরের সামনে থাকা মৃণাল হকের 'লালন ভাস্কর্য' নিয়েও সমালোচনা হয়েছিলো। পরে তা সরিয়ে নিয়েছিলো সরকার। সেই বছরই মতিঝিলের বলাকা ভাস্কর্যেও ভাংচুর করেছিলো একটি ইসলামী সংগঠন। সাম্প্রতিক সময়ে এসে গুলশানে 'সেলিব্রেটি গ্যালারি' নির্মাণ করেছিলেন ভাস্কর মৃণাল হক। যেখানে বিভিন্ন সেলিব্রেটির মোমের মূর্তি স্থাপণ করা হয়। কিন্তু এই গ্যালারি প্রশংসার বদলে সমালোচনা কুড়োয় বেশি। মুখের আদল ঠিক না থাকা, চেহারা বিকৃতি সহ নানা কারণে সেগুলো সমালোচনার মুখে পড়ে।

এটা ঠিক, তাঁর ভাস্কর্য নিয়ে যে পরিমাণ আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, এরকম হয়নি আর কারো ভাস্কর্যের ক্ষেত্রেই। হয়তো তাঁর নির্মিত ভাস্কর্য নিয়ে সামনেও বিস্তর কথাবার্তা হবে। কিন্তু এ কথা স্বীকার করতেই হবে, এ দেশে যখন ভাস্কর্যের সংস্কৃতিটিও ঠিকভাবে গড়ে ওঠেনি, মৃণাল হকের মত কিছু শিল্প-পাগল মানুষ এসেই এ দেশকে সাজানো শুরু করেছিলেন তাদের শিল্প-ক্ষমতা দিয়ে। বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে তাঁরা গিয়েছেন, একটি পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন এদেশের ভাস্কর্য-শিল্প'কে। আরেকটা বিষয়েও মৃণাল হক ঠিক আমাদের মন জয় করে নেন। তিনি থাকতে পারতেন বিদেশে, যথেষ্ট বিলাস-ব্যসনের মধ্যে। জনপ্রিয়ও ছিলেন তিনি সেখানে। কিন্তু ভেতরে মাটির সোঁদা গন্ধের ঘ্রাণ উপেক্ষা করতে পারেননি তিনি। সব ছেড়েছুড়ে চলে আসেন নিজের দেশে। তাঁর সাথে আমরা যাবজ্জীবন কীরকম ব্যবহার করেছি বা না করেছি, সে নিয়ে হয়তো অনেক কথা বলা যাবে। কিন্তু সে প্রসঙ্গ উহ্য থাকুক। এটাই বলার, তাঁর প্রয়াণের এ বিচ্ছেদ প্রবল, গভীর ও চিরন্তন। এবং মৃণাল হকের প্রয়াণে যে শূন্যস্থান, তা কাটতে সময় লাগবে অনেকদিন।

বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি, ভাস্কর। ওপারে নিরাপদে থাকবেন, এটাই কামনা।  

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা