সম্প্রতি দেখা হল প্রিয় পরিচালক বং জন হু’র নতুন সিনেমা ‘প্যারাসাইট’। এবারের কানে পাম দি’অর পুরষ্কার পাওয়া এই সিনেমার শুরু থেকেই মনে হতে লাগলো নতুন কোন গল্পের একটা সিনেমা দেখবো বোধহয়। কিন্তু সিনেমা শেষে বুঝতে পারলাম খুব পরিচিত গল্পের এই সিনেমা। শুধু বং জন হু নতুনভাবে আমাকে দেখিয়েছেন। তাতেই সিনেমাশেষে দিগ্বিদিক অবস্থা, সিনেমা দেখে এতো তৃপ্তি বিগত কয়েক মাসে পাই নি বললেই চলে। নির্দেশকের মুনশিয়ানায়, অভিনেতাদের দক্ষ অভিনয়ে, গল্পের নিদারুণ বর্ণনায় হৃদয় নিংড়ে নিয়েছে প্যারাসাইট।

প্যারাসাইটের গালভরা একটা ডেফিনেশন আছে। ছোটবেলায় বিজ্ঞান বইতেও আমাদের সবার পড়া। An organism that lives in or on an organism of another species (its host) and benefits by deriving nutrients at the other's expense. সহজ কথায় যেসব জীব অন্য জীবের ভেতর অবস্থান করে নিজের অস্তিত্বের জন্য সে জীবের ওপর নির্ভর করে তাকেই পরজীবী বলে। এমনই এক পরজীবী পরিবারের সন্ধান পাই আমরা ‘প্যারাসাইট’ সিনেমায়। সিনেমার শুরুতেই বেসমেন্টের নীচের এক ছোট্ট বাসায় কিম পরিবারের দেখা পাই আমরা। যে পরিবারের দিনাতিপাত হয় পিজ্জার বাক্স বানিয়ে। যে বাসায় থেকে পাশের ক্যাফের ওয়াইফাই খুঁজে পেতে কমোডের ওপর গিয়ে বসে থাকা লাগে।

সিনেমাটির আইকনিক একটি দৃশ্য

চারজনের এই পরিবারের অস্বচ্ছলতা আমরা টের পাই ঠিকই, কিন্তু জীবনের প্রতি তাদের আকাঙ্ক্ষা আর সুখের সন্ধানে সুখী থাকার ফিলোসফি আমাদের সে অসচ্ছলতা নিয়ে বিব্রত করে না। তাদের মতো আমরাও যেন আশা করছি মিরাকুলাস কিছু একটা হবে আর তাদের অবস্থার পরিবর্তন হবে। ঠিক সেরকমই কিছু হয়। জাল সার্টিফিকেট তৈরি করে পরিবারের ছেলেটি একটি টিউশন যোগাড় করে ফেলে শহরে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত উচ্চবিত্ত এলাকার একটি বাসায়। সেখানে পার্ক পরিবারের টিনেজ বালিকার ইংরেজি টিচার হিসেবে সুযোগ পায় ছেলেটি। অসচ্ছলতার মাঝে যে সততার কোন স্থান নেই সেটিই আমরা বুঝতে পারি যখন ছেলেটি উচ্চবিত্ত পরিবারের কর্ত্রীর সরলতার সুযোগ নিয়ে তার বোনকেও আর্ট টিচার হিসেবে সে পরিবারের ছোট ছেলের জন্য টিউশন যোগাড় করে দেয় সেই একইভাবে জাল পরিচয় দিয়ে। প্রথমবারের মতো সচ্ছলতার স্বাদ পাওয়া এই পরিবারের মাঝে যেন পরজীবী হবার ঝোঁক ওঠে। একে একে প্রচণ্ড চতুরতার সাথে আমরা দেখতে পাই পুরো কিম পরিবার পার্ক পরিবারের অংশ হয়ে ওঠে। সবাই ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় দিয়ে সেখানে কাজ জুটিয়ে নেয়। পার্ক পরিবারের ভেতর অবস্থান করে তাদের বিত্তের অংশ অল্প অল্প করে নিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব পরজীবীর মতোই টিকিয়ে রাখছিল কিম পরিবার। কিন্তু বং জন হুর সিনেমায় এতো সরলভাবে সব হওয়া সম্ভব না।

দ্বিতীয় পর্বে এসে তাই কাহিনী পট পরিবর্তন করলো সাঁই সাঁই করে। দর্শকমন তটস্থ, উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্তের স্যাটায়ারিক্যাল পরজীবী গল্পে উপসংহার যেন প্রাণ সংহার করতেই উদ্যত হল। আমরাও পরিচিত হলাম নিষ্ঠুর বাস্তবতার সাথে, যে বাস্তব জীবনে হাসি-ঠাট্টা-সুখ সব ক্ষণিকের; পরজীবীদের জন্য তো তা আরও নিদারুণ।

ধীরে ধীরে নিষ্ঠুর বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যায় সিনেমাটি

সিনেমাজুড়ে কিম পরিবারের ছোট ছেলে, যার ন্যারেশনেই পুরো গল্প বলে গেছেন পরিচালক, বারবার একটি ডায়লগ দিচ্ছিল- ব্যাপারটা বেশ মেটাফোরিক্যাল। আসলেও পরিচালক মেটাফোরিক্যালিই সব বলে গেছেন সিনেমার প্রথম থেকে। কিম পরিবারকে আমরা পাই শহরের নিম্নবর্তী এক অঞ্চলে, যেখানে বেসমেন্ট সদৃশ এক এপার্টমেন্টে তাদের থাকতে হয়। আর পার্ক পরিবারের বিলাসবহুল বাসাটি খুঁজে পাওয়া যায় পাহাড়ের পাদদেশে। এতো উঁচুতে যে নীচের কিছুই আর চোখে পড়ে না। উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্তকে যেন পরিচালক চোখে আঙুল দিয়েই দেখিয়ে দিলেন। সিনেমার সবচেয়ে করুণ অংশে মুষলধারে বৃষ্টিতে আমরা ডুবে যেতে দেখি শহরের সেই নিম্নাঞ্চলটিকে, সেখানকার মানুষরা হয়ে যায় উদ্বাস্তু। কিম পরিবারের বাড়িটিও তখন কোমর পানির নীচে। কমোড থেকে উথলে আসছে ময়লা পানি। তার ওপর বসে সিগারেট ধরায় যখন কি ইয়ং, পরিবারের বড় মেয়ে তখন বোঝা যায় জীবনকে ওরা এভাবেই মেনে নিয়েছে। বন্যার কারণে সেদিন রাতে সে অঞ্চলের অস্বচ্ছল মানুষগুলোকে থাকতে হয় খোলা ময়দানে।

প্যারাসাইট ঠিক সেরকম এক স্বাদ লাগিয়ে দিয়ে গেছে। সিনেম্যাটিক ব্রিলিয়ান্স, অভিনেতাদের অসামান্য অভিনয়, ক্যামেরার দুর্দান্ত কাজ, বং জন হুর আউট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড ডিরেকশন সব মিলিয়ে শ্রী বৃদ্ধি করেছে গল্পের। যে গল্পটা আমাদের যাপিত জীবনের, যে গল্পটা পরজীবীদের। এমন গল্পগুলোর শেষটা খুব নিদারুণ হয়, প্যারাসাইটেরও তাই। যদি পরজীবী হয়েও আপনার-আমার গল্পে শেষটা সুখময় হয় তাহলে মনে রাখবেন সেটি শেষ নয়। যেখানে পৃথিবীর শেষই সুখময় নয়, যেখানে মানুষের শেষ সুখময় নয়, সেখানে প্যারাসাইটগুলোর শেষ কীভাবে সুখের হয়! অস্তিত্ব বিলীন হওয়া সেসব নামানুষ পরজীবীদের গল্পই প্যারাসাইট।

আরও পড়ুন-


ট্যাগঃ

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা