টেকনিক্যাল মোড় থেকে একটু সামনে পাঠাও অ্যাপ অন করে দাঁড়িয়ে আছি৷ রাত প্রায় ১০টা বাজে তখন...

মোহাম্মদ মেহেদী আলম: হাতে ছোট একটা কাপড়ের ব্যাগ আর টুপি পাঞ্জাবী পড়া এক ছেলে এসে জিজ্ঞেস করছে, ভাই ঘাটে যাবেন? উত্তরে পালটা জিজ্ঞেস করলাম, কোন ঘাট? বললো সদরঘাট।

আমি পাঠাও ইউজার অ্যাপ ওপেন করে দেখলাম ভাড়া আসে ১৯০ টাকার মতো। তাকে বললাম, আমি তো এভাবে কাউকে নেই না। অ্যাপের মাধ্যমে নেই শুধু। আপনার অ্যাপ আছে? কিছু না বলে অন্য দিকে চলে গেল৷ আমি ডেকে বললাম, চুক্তিতে গেলেও ১৭০-৯০ টাকার বেশি যায়েন না৷ এরকম ভাড়া আসবে৷ সে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজনের সাথে কথা বললো৷ সম্ভবত ওনার সাথেও মিলে নাই৷ তাই হাঁটা দিল সামনের দিকে৷

একটু পর দেখলাম সে হাঁটছে৷ বাসেও উঠে না, আবার বাইকেও উঠে না৷ এপ বন্ধ করে তার সামনে গিয়ে বললাম, উঠেন৷ পল্টন পর্যন্ত যেতে পারবেন আমার সাথে৷ আমি ওদিকেই যাব। ভাড়া লাগবে না৷ একটা স্মিত হাসি দিয়েই থ্যাংকিউ বলে বাইকে উঠতে নিল৷ আমি বললাম আগে হেলমেটটা পড়ে নেন৷ হেলমেট পরিয়ে বাইকে উঠালাম। তারপর পল্টনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

পথিমধ্যে অনেক কথা হলো৷ মিরপুরে একটা ফার্নিচারের দোকানে মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করে৷ মায়ের অসুস্থতার খবরে জরুরী ভিত্তিতে আজকেই চাঁদপুর যাচ্ছে তিনদিনের ছুটি নিয়ে৷ জিজ্ঞাসা করলাম, আমার পরে পিছনে আরেকজনকে যে জিজ্ঞেস করলেন, উনি ভাড়া কত চাইলো? উত্তর দিল ১৫০ টাকা৷ সে ১২০ টাকা পর্যন্ত বলেছে কিন্তু রাজী হয়নি৷ তাই হাঁটা দিয়েছে। এমনিতেই অনেক কষ্ট করে ঢাকায় থেকে কাজ শিখছে। বেশি টাকা খরচ করা সম্ভব না৷ অনেকটা হিসেব করেই চলতে হয়৷

পরে জিজ্ঞাসা করলাম, বাসেও তো উঠলেন না৷ যেতেন কীভাবে? তিনি বললেন, 'আল্লাহর নামে হাঁটা দিছিলাম৷ ব্যবস্থা একটা হইতো৷ বাসে উঠতে পারি না। বমি আসে শুধু'৷

মাঝপথে আরো অনেক কথাই হলো৷ তার লঞ্চের শেষ সময় ১১টা ১৫ মিনিট৷ ঘড়িতে তখন ১০টা ১৫ বাজে৷ আমরা বিজয় সরণি সিগন্যাল ক্রস করলাম৷ সে একটু চিন্তিত মনে প্রশ্ন করলো- ভাইয়া যেতে পারবো তো? এই সময়টায় গুলিস্তানে প্রচুর জ্যাম থাকে৷ তাকে পল্টন নামিয়ে দিলে হয়তো বাকি পথ আবার বাইকেই উঠতে হবে৷ তারপর মনে মনে প্ল্যান চেঞ্জ করলাম যে সদরঘাটেই নামিয়ে দিব। তাকে উত্তর দিলাম- হ্যাঁ, যেতে পারবেন৷ কোন সমস্যা নাই৷ সে তখনো জানে তাকে পল্টনেই নামিয়ে দিব আমি৷ পল্টন পার হয়ে গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট পার হয়ে যাচ্ছি৷ তারপর প্রচুর জ্যাম ঠেলে সদরঘাট এসে নামালাম ১০টা ৪৯ মিনিটে৷ তার লঞ্চ তখনো ছেড়ে যায়নি৷ অপেক্ষায় আছে।

নামার পর সে পকেট থেকে টাকা বের করছে৷ সে হয়তো ভাবছে আমি অন্তত ১২০ টাকা হলেও নিব৷ যেহেতু তাকে একদম শেষ লোকেশনে নিয়ে এসেছি৷ আমি বললাম- টাকাটা আপনার কাছেই রাখেন৷ মায়ের জন্য কিছু নিয়েন৷ আমাকে দিতে হবে না৷ এবার তার মুখের হাসিটা কেমন যেন ছিল৷ আমি নিজেই তার হাসির মায়ায় পড়ে গেছি৷ সে খুশি হয়েছে, তবে কীভাবে প্রকাশ করবে বুঝতে পারছে না৷ তার হাসিতে ব্যাপারটা স্পষ্ট ফুটে উঠছিল বারবার। আমি দ্রুত ওখান থেকে চলে আসলাম৷ আবেগ চলে আসলে সমস্যা। চোখে পানি এসে যাবে৷ আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।

সম্ভবত ১৯০ টাকা খুব বড় একটা এমাউন্ট না৷ তবে এই মুহূর্তে আমার কাছে এই টাকাটা কমও না। আমি জানি না সে ভবিষ্যতে কী হবে৷ তবে কখনো যদি সফল ব্যাবসায়ী বা এরকম কিছু হয়, আর সে তার স্ট্রাগলের গল্প শেয়ার করে কারো সাথে, তাহলে নিশ্চয়ই আমার নামটা আলাদা করে বলবে। আমি এইটুকুতেই খুশি! রাতের ঢাকায় এরকম কত গল্পই তো থাকে৷ আজকের গল্পটা না হয় আমিই শেয়ার করলাম!

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা