বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন গায়িকা নিজেদের অনন্য স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন, যেটা অনেক গায়কই পারেননি। সামিনা চৌধুরী হয়তো নিজেকে সে পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেননি, তবে অল্প কিছু গানের জন্য তিনি মানুষের মনে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে আছেন, চিরকাল থাকবেন।

'আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকবো', 'আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে'র মতো সুপারহিট গান গেয়েও আশির দশকে সিনেমার গানে কেন নিয়মিত হলেন না সেটা রহস্যজনক। তখন সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লার দাপট, হিট গান মানেই এই দুইজন। এমনকি সামিনার এই দুইটি হিট গান তখন অনেকে উনাদের গান ভাবতেন। সেই জন্যই হয়তো আধুনিক গানের দিকে ঝুঁকে গিয়েছিলেন সামিনা। টিভিতে তখন একের পর এক দারুণ গান গেয়েছেন। এই গানগুলো শুনলে মনে হবে কতটা শৈল্পিক হতে পারে গানগুলো, তিনি নিজেও সুনির্বচনীয় ছিলেন। 

সামিনা চৌধুরীর কন্ঠে আলাদা একটা মায়া বা মাদকতা ছিল। বিটিভিতে গাওয়া 'কোনো এক সুন্দরী রাতে' বা ঐ ঝিনুক ফোঁটা সাগর বেলার কথাই ধরা যাক৷ এমন অসাধারণ বা ব্যতিক্রমী গানের কথা তখন খুব সচরাচর ছিল না। সিনেমার গানের বাইরে যারা গান লিখতেন, সুর করতেন বা যারা আধুনিক গানের বিকাশ ঘটিয়েছেন তাদের সাথেই কাজ করেছেন৷ যাদের অনেকেরই নাম অনেক শ্রোতা হুট করে বলতে পারবে না। নকীব খানের সঙ্গে 'তুমি এলে পায়ে পায়ে' তার অন্যতম জনপ্রিয় ডুয়েট গান৷ এর মাঝে ক্যারিয়ারে ব্যক্তিগত অভিমান, টানাপোড়ন ছিল! 

'কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে' সামিনার গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় গান। তবে গানটির প্রথম শিল্পী ছিলেন শাকিলা জাফর। গীতিকার কাওসার সাহেব ও সুরকার প্রয়াত লাকী আখন্দের মনোঃপুত না হওয়ায় সামিনাকে দিয়ে গাওয়ান, এরপর তো ইতিহাস৷ তাঁর গাওয়া আরেকটি অসাধারণ গান 'এই যাদুটা যদি সত্যি হয়ে যেত'। সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, এমন গান খুব কম শিল্পীই গেয়েছেন৷ নব্বইয়ের পরে  আমাদের অডিও ইন্ডাস্ট্রিটা অনেকটাই পুরুষ শাসিত ছিল, গায়িকাদের মধ্যে মমতাজেরই এলব্যাম সুপারহিট হতো, ডলি সায়ন্তনী, বেবী নাজনীনদের এলব্যাম চললেও ধারাবাহিক ছিল না। এর মাঝে সামিনার ফুল ফোটে ফুল ঝরে, এই বুঝি তুমি এলে এইসব বেশ ভালোই সাড়া ফেলেছিল। সামিনার গাওয়া অনেক পুরনো গান নতুন করে এলব্যামে রেখেছিল। 

ফিরে আসা যাক সিনেমার গানে। একেবারেই স্থুল বাণিজ্যিক সুপারহিট ছবি 'প্রেম দিওয়ানা' ছবিতে সামিনা চৌধুরীর গাওয়া চন্দ্র সূর্য সবই আছে গানটাই ছিল উজ্জ্বল, যদিও যথোপযুক্ত আলোকিত হননি। এরপরেও প্লেব্যাকে নিয়মিত হননি, ততদিনে রুনা, সাবিনা ম্যাডামরা প্লেব্যাক কমিয়ে দিচ্ছেন ধীরে ধীরে, সেই জায়গা দখল করে নিল কনকচাঁপা। 

ছবি কৃতজ্ঞতা- ডেইলি স্টার  

'আমার মাঝে নেই এখন আমি'- রানী কুঠির বাকী ইতিহাস সিনেমার এই গান দিয়েই সামিনা চৌধুরী উজ্জ্বল আলোয় আসেন। এর আগে গান করেছেন ঠিক, তবে চারিদিকে যে আলোচনা যা বুঝায় তা এই গান দিয়েই পেয়েছিলেন, একই বছর না বোলো না সিনেমার নদী চায় চলতে, না বোলো না গানগুলি জনপ্রিয় হওয়ায় প্লেব্যাকে নতুনভাবে উচ্চারিত হতে থাকেন সামিনা, বাঙলা সিনেমার 'কথার ও ভিতরে কথা থাকে' গানটাও মুগ্ধতা ছড়ায়। সামিনাও প্লেব্যাকে নিয়মিত হয়ে পড়েন। তবে ততদিনে বাংলা ছবির গানের জনপ্রিয়তা দিন দিন কমতে থাকে। তুমি আছো হৃদয়ে, দূরদ্বীপবাসিনী গান যেমন গেয়েছেন, তেমন প্রানের স্বামীর মতো স্থুল গানও গেয়েছেন। আবার রবীন্দ্র সংগীতও গেয়েছেন, প্রশংসিত হয়েছেন। 

সামিনাও একটা সময় পর প্লেব্যাক থেকে সরে আসেন। রুনা, সাবিনা ও কনকের মতো প্লেব্যাকে বিশেষ হয়তো হতে পারেননি, তবে ভালো গানের সংখ্যা বেশ আছে। নয়নের আলো সিনেমার জন্যই জাতীয় পুরস্কার পেতে পারতেন, জুরি বোর্ড হয়তো প্রথিতযশাদের ছাপিয়ে নতুন কাউকে পুরস্কার দিতে চাননি। কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টির জন্যও পেতে পারতেন। অবশেষে রানী কুঠিরের জন্য তিনি অধরা জাতীয় পুরস্কার পান, একই বছরে প্রকাশিত গান না হলে না বোলো না, বাঙলার জন্যও পেতে পারতেন!

শেষ কবে প্লেব্যাক করেছেন এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না, অনেকদিন আধুনিক গানও করছেন না। আবার তিনি ফিরে আসুক।

২০০৫-০৬ এর দিকে বিটিভিতে কবির বকুলের উপস্থাপনায় একক শিল্পীর গান নিয়ে সঙ্গীত সম্ভার নামে একটি অনুষ্ঠান হতো। ঐ অনুষ্ঠানের এক পর্বে সামিনা চৌধুরীর সব গান শুনে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এর আগে তাঁর গানগুলো কম শোনা হয়েছিল। 

বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন গায়িকা নিজেদের অনন্য স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন যেটা অনেক গায়কই পারেননি। সামিনা চৌধুরী হয়তো নিজেকে সে পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেননি, তাদের মতো বিশেষ স্থানে অল্প কয়জনই যায়। সেই বিশেষ কয়জনকে বিশেষভাবে রেখেই বলছি, বাংলাদেশে আমার সবচেয়ে প্রিয় গায়িকা 'সামিনা চৌধুরী'। 

শেষ করছি উনার গাওয়া সেই মন হারানো গান দিয়ে 'সময় যেন কাটে না, বড় একা একা লাগে। শুভ জন্মদিন, প্রিয় শিল্পী। 

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা