আর মাত্র কয়েক মাস, বড়জোর বছরখানেক বাঁচবেন ভদ্রলোক। এই সীমিত সময় নিয়ে কী করবেন তিনি? বাকি দিনগুলো সর্বোচ্চ কাজে লাগাবেন কীভাবে?

পাঠানুভূতি: When Breath Becomes Air, 

লেখক: পল কালানিথি 

দুশ ছাব্বিশ পৃষ্ঠার ছোট্ট একটা বই, একজন ক্যান্সার রোগীর শেষ দিনগুলোর স্মৃতিচারণ নিয়ে। মিনিট বিশেক আগে শেষ করেছি, এই বিশ মিনিট স্রেফ চুপ করে বসে ছিলাম। সামনে রাখা ভাত আর মাশরুমের টুকরোগুলোকে মনে হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাবার, সামনে বসে থাকা মধ্যবয়ষ্ক ভদ্রলোক আর তাঁর পিচ্চি মেয়েটার কথোপকথনের দৃশ্যটাকে মনে হচ্ছে জগতের সুন্দরতম দৃশ্য, আজকের দিনটাকে মনে হচ্ছে জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। কেন জানেন? 

আমি বেঁচে আছি! পল কালানিথি ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান নিউরোসার্জন, ইয়েল মেডিকেল স্কুলের গ্রাজুয়েট, স্ট্যানফোর্ড আর কেমব্রিজে পড়াশোনা করা অসম্ভব মেধাবী মানুষদের একজন। পঁয়ত্রিশ বছর বয়েসে তাঁর ঝুলিতে এসেছে সেরা রিসার্চারের এ্যাওয়ার্ড, খ্যাতি,অর্থ, প্রিয়তমা স্ত্রী- একজন মানুষ যা যা চাইতে পারে তার সবকিছু। কিন্তু নিয়তি কেন বাধ্যতে! ললাট লিখন কে খন্ডাতে পারে! 

পঁয়ত্রিশ বছর বয়েসে এসে তাঁর ক্যান্সার ধরা পড়ল, যার কোন আরোগ্য নেই। যে মানুষটা নিউরোসার্জারির ফিল্ডটাকে অনন্য উচ্চতায় নেবার মতো মেধা ও স্বপ্ন দুটোই লালন করতেন, তাঁর আপাত অসামান্য স্বপ্নময় জীবনে নেমে এক নির্মম সীমাবদ্ধতা- তিনি আর মাত্র কয়েক মাস, বড়জোর বছরখানেক বাঁচবেন। 

এই সীমিত সময় নিয়ে কী করবেন পল? বাকি দিনগুলো সর্বোচ্চ কাজে লাগাবেন কীভাবে? জীবনের মর্মার্থ খুঁজতে দর্শন ও নিউরোসার্জারি অধ্যয়ন করা মানুষটি কি জীবনের মর্মার্থ খুঁজে পাবেন? যদি পান, সেটা কী? মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন মানুষ কীভাবে তার জীবনকে সাজাবে? তার প্রিয়তমা স্ত্রী-ই বা কীভাবে সামলাবে এই মর্মান্তিক পরিণতি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে পড়ুন এ বইটি। 

মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে একজন মানুষ কীভাবে তার জীবনকে সাজাতে চায়, তাই বোঝা যায় বইটি পড়লে  

এ ধরনের বই এটাই আমার জন্য প্রথম নয়, এর আগে পড়েছি প্রফেসর র‍্যান্ডি পশের দি লাস্ট লেকচার। এ বইটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে লেখকের পরিমিতিবোধ ও নিস্পৃহ মনোভাব। গোটা বইতে একটা লাইনকেও নাটকীয় মনে হয়নি, কোথাও মনে হয়নি লেখক কারো সহানুভূতি চাইছেন। অথচ এই সাদামাটা ভাষায় লেখা বইটি শেষ করার পর টের পেয়েছি, অজান্তেই দুচোখ দিয়ে নেমে এসেছ অশ্রুধারা। পলকে মনে হয়েছে খুব কাছের মানুষ, নিকটাত্মীয় হারানোর বেদনা অনুভব করেছি। 

পলের লেখার যে জিনিসটি সবচাইতে আকর্ষনীয় তা হচ্ছে এর নিখাঁদ প্রাগমাটিজম বা বাস্তববোধ। "আরে ধুর এই ক্যান্সার আমি হজম করে ফেলব" বা "হে খোদা আমার ক্যান্সার হয়েছে, আমি শেষ"- অবাস্তব আশাবাদ বা হতাশা- দুটোর কোনটাকেই তিনি আঁকড়ে ধরেননি। জীবনের মত মৃত্যুকেও তিনি নিয়েছেন একটা প্রক্রিয়া হিসেবে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের আত্মসম্মান ধরে রেখেছেন। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে এর অমর বানী, "Man can be destroyed but never defeated" এর বাস্তব প্রতিমূর্তি যেন পল কালানিথি।

When Breathe Becomes Air ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধের গল্প নয়, জীবনের অমোঘ সত্য মৃত্যুকে মেনে নেবার পরেও মাথা উঁচু করে, হাসিমুখে বিদায় নেবার গল্প। বইটির প্রথম ভাগে আপনি পলের ছেলেবেলার এ্যাডভেঞ্চারের সাথে একাত্ম হয়ে যাবেন, সেই সাথে একজন নিউরোসার্জনের প্রচন্ড কঠিন জীবন সম্পর্কে একেবারে অপারেটিং রূমের ভেতরে বসে ধারণা করতে পারবেন। 

স্ত্রী-সন্তানসহ পল কালানিথি

দ্বিতীয় অংশে জানবেন কিভাবে ক্যান্সার একটা মানুষের সাজানো বাগানকে তচনচ করে দেয়, কিভাবে এই ছিন্নভিন্ন বাগানে দাঁড়িয়েও মানুষ লড়াই করে। 

বইটির সবচাইতে আকর্ষনীয় এবং হৃদয়বিদারক অংশ হচ্ছে এর এপিলোগ বা উপসংহার- যেটি প্রয়াত পল কালানিথির স্ত্রী লুসি কালানিথির লেখা। স্পয়লার দিচ্ছি না, তবে একটা অংশ উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। চূড়ান্ত সময়ের কয়েক দিন আগে লুসি অসুস্থ স্বামীকে জিজ্ঞাসা করেন- আচ্ছা, আমি তোমার বুকে মাথা রাখলে নিশ্বাসের অসুবিধা হয় না তো? পল হেসে উত্তর দেয়- এটাই তো একমাত্র উপায় যেভাবে আমি নিঃশ্বাস নিতে পারি! 

When Breath Becomes Air হৃদয় বিদীর্ণ করা কষ্টের গল্প, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে জীবনের গল্প, পরিবারের অমূল্য বন্ধনের গল্প। তবে সব কিছু ছাপিয়ে এটি আসলে ভালবাসার গল্প, পুরোটাই যার বাস্তব। প্রিয় পাঠক, বইটি আপনার জীবনবোধের গভীরতা বাড়াবে, জীবনকে ভালবাসতে শেখাবে। অনেক আগে নাম ভুলে যাওয়া একটা হলিউড মুভির দৃশ্যে একটি সংলাপ ছিল এরকম:

"In the end of the day we all have to go. The question is, on my feet or on my knees?"

ডক্টর পল সুমিত কালানিথি ওয়েন্ট অন হিজ ফিট, নট নীজ! 

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা