এগিয়ে চলো এক্সক্লুসিভ

মিউজিক এন্ড টেরর- রত্নম ও রহমানের ভালোবাসার দর্শন! (পর্ব ২)

2 / 4

মিউজিক এন্ড টেরর- রত্নম ও রহমানের ভালোবাসার দর্শন! (পর্ব ২)

মিউজিক এন্ড টেরর- রত্নম ও রহমানের ভালোবাসার দর্শন! (পর্ব ২)
  • পড়তে সময় লাগবে মিনিট
  • পড়তে সময় লাগবে মিনিট

মদ্র রাজ্যের অধিপতি অশ্বপতি দিন নেই, রাত নেই বছরের পর বছর পুজো করতেন সূর্যদেবতা সাবিত্রকে। এতে করে সূর্যদেবতা সন্তুষ্ট হয়ে অশ্বপতিকে বর দান করেন। অশ্বপতির কোল আলো করে আসে এক কন্যাসন্তান। তিনি তার নাম দেন সাবিত্রী। সাবিত্রী রূপে-গুণে অনন্যা। তার সৌন্দর্য যেমন সূর্যের মতো উজ্জ্বল তেমনই কোমল ও কঠোর তার স্বভাব।

অশ্বপতির নির্দেশ পেয়ে সাবিত্রী বিবাহযোগ্য হয়ে উঠলে নিজেই তার পাত্র সন্ধানে যাত্রা করেন। শাল্ব দেশের অন্ধ রাজা দ্যুমৎসেনের পুত্র সত্যবানকে পছন্দ হয় সাবিত্রীর, তাকেই সে মনেপ্রাণে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে চায়। কিন্তু রাজা তখন অন্ধ হয়ে বনবাসে আর ওদিকে দেবর্ষি নারদ জানায় যে সত্যবান সৎ, নিষ্ঠাবান ও সত্যবাদী হলেও তার আয়ু যে আর মাত্র এক বছর। এক বছর পরই সত্যবান মৃত্যুবরণ করবেন।

কিন্তু সাবিত্রীকে কোনভাবেই কেউ টলাতে পারলো না, সে সত্যবানকেই বিয়ে করলো। দুজনের সুখের সংসার ভালোই চলছিল কিন্তু সাবিত্রী কখনোই সত্যবানকে বলেনি তার মৃত্যুর কথা। এক বছর পূর্ণ হবার চারদিন আগে থেকে সাবিত্রী উপবাস শুরু করলো। সত্যবানের মৃত্যুর দিন সত্যবান কাঠ ও ফলমূল সংগ্রহে করতে বনের গভীরে যেতে চাইলে সাবিত্রীও গোঁ ধরেন যে সেও তার সাথে যাবে। সত্যবান না চাইলেও সাবিত্রী জোর করে তার সাথে যায়।

বনের ভেতর কাঠ কাটতে গিয়েই সত্যবান অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সাবিত্রীর কোলে মাথা রেখে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সাবিত্রী তখন দেখা পায় ভীষণদর্শন যমের। যম এসে সত্যবানের প্রাণ ও প্রাণহীন দেহ নিয়ে চলা শুরু করে। সাবিত্রীও পিছু নেয় তার। উপবাসে ক্লান্ত সাবিত্রীকে বারবার ফেরত চলে যেতে বলেন যম, কিন্তু সাবিত্রী অনড়। তার স্বামীকে ছাড়া সে এখান থেকে যাবে না। সাবিত্রী যমকে ধর্মকথা শোনানো শুরু করে, সাবিত্রীর নিষ্ঠা ও স্বামীর প্রতি ভালোবাসা দেখে যম সাবিত্রীকে তার স্বামীর জীবনদান করেন। এভাবেই মৃত্যুর মুখ থেকে তার স্বামী সত্যবানকে ছিনিয়ে আনে সাবিত্রী।

কী ভাবছেন? মণি রত্নমের ট্রিলোজির রোম্যান্স নিয়ে পড়তে এসে সাবিত্রী-সত্যবানের পুরাণকথা কেন শোনাচ্ছি? কারণ মণি রত্নম সন্ত্রাসবাদকে যেমন নিয়েছেন দেশের চলমান অস্থিরতাকে প্রকাশ করার জন্য, তেমনি ভালোবাসাকে নিয়েছেন তার নিজস্ব দর্শন, বিশ্বাস ও পৌরাণিক ভাবকথাকে উপজীব্য করার জন্য। সাবিত্রী-সত্যবানের উপাখ্যান ছোট করে লেখা সে ভালোবাসার স্বরূপ বোঝাতেই।

‘রোজা’ সিনেমায় কেবল কাশ্মীর কেন্দ্রিক অস্থিরতার গল্পই বলেননি নির্দেশক, সাবিত্রী-সত্যবানের মিথ থেকে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ও স্ত্রীর হার না মানা মানসিকতাকেও দেখাতে চেয়েছেন। এই গল্পে আমরা দেখা পাই রোজার, তিরুনেলভেলির গ্রামে যার সহজিয়া জীবনযাপন। রোজার সরলতা, সহজ সোজা দৃষ্টিভঙ্গি সিনেমার প্রথম পনের মিনিটেই যেন স্ট্যাবলিশ করে ফেলেন পরিচালক।

কাশ্মীর কেন্দ্রিক অস্থিরতা, স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ও স্ত্রীর হার না মানা মানসিকতাকে কেন্দ্র করেই রোজা সিনেমার গল্প

তারপর সেখানে আগমন ঘটে ঋষি কুমারের। শহর থেকে যে গ্রামে এসেছে বিয়ে করার জন্য। রোজার বড় বোনকে দেখতে আসা ঋষি ঘটনাক্রমে বিয়ে করে ফেলে রোজাকে, যেটা রোজা কোনভাবেই মেনে নিতে পারে না। কিন্তু রোজা জানে না তখনো যে তার বড় বোনই ঋষিকে বলেছিল বিয়েতে মানা করে দেয়ার জন্য। ঋষি আর রোজার দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছাতে না পৌছাতেই রোজা জানতে পারে তার বোনই মানা করেছিল এই বিয়েতে। রোজার মাঝে একইসাথে অপরাধবোধ ও ভালোবাসার সঞ্চার হয়। ঋষি আর রোজার মাঝে মিষ্টিমধুর প্রেমের সূত্রপাত দেখতে পাই আমরা।

এরই মাঝে ঋষিকে কাজের কারণে কাশ্মীরে যেতে হবে। রোজা গোঁ ধরে বসে যে সেও তার সাথে কাশ্মীর যাবে। সাবিত্রী সত্যবানের ঘন গভীর জঙ্গল এখানে যেন অশান্ত অস্থির কাশ্মীর। সত্যবান ঋষিকে সে বিপদের মধ্যে একা যেতে দিতে চায় না সাবিত্রী রোজা। কাশ্মীরে গিয়ে একইসাথে রোজার চোখ দিয়ে কাশ্মীরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য আবিষ্কার করে দর্শক, দুজনের ভালোবাসা গভীর থেকে গভীরতর হয়। আর এরই মাঝে সন্ত্রাসীদের হাতে অপহৃত হয় ঋষি কুমার। ঠিক যম যেমন সত্যবানের প্রাণ হরণ করে রওয়ানা দিয়েছিল আর সাবিত্রী তার পিছু নিয়েছিল, ঋষিকেও অপহরণ করার পর কাশ্মীরের সেনাবাহিনী-পুলিশকে পাগলের মতো তাড়া করে রোজা।

এমনকি কঠোর নিরাপত্তার মাঝে থাকা সন্ত্রাসী ওয়াসিম খানেরও মুখোমুখি হয় সে। রোজা যেকোনো উপায়ে ঋষিকে ফেরত পেতে চায়। গ্রামের সে সরল সোজা স্রোতহীন নদীর মতো মেয়েটি হুট করেই যেন ভালোবাসার তাগিদে হয়ে ওঠে বিশাল ঢেউ। সে ঢেউ প্লাবিত করে কাশ্মীরের কঠোর সেনাবাহিনীকে, দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীপরিষদকে। রোজার জেদের কারণেই ঋষি কুমারকে উদ্ধার করার জন্য সন্ত্রাসীদের দেয়া শর্তে রাজি হয় প্রশাসন।

শেষমেশ ঋষি লিয়াকতের বোনের সাহায্যে পালিয়ে আসতে সক্ষম হলেও মূলত রোজার ভালোবাসা ও নিষ্ঠার কারণেই যেন এই জীবনদান পায় সে। মণি রত্নম কাশ্মীরের রক্ত শাদা তুষারে আঁকেন মহাভারতের সে পৌরাণিক ভালোবাসার উপাখ্যান।

মণি রত্নম শুধু প্রেম দেখানোর জন্য দেখাননি। তিনি আবহও সৃষ্টি করেছেন। প্রতিটি সিনেমায় তিনি তার আবহাওয়া বদল করেছেন। রোজা সিনেমায় কাশ্মীরের তুষারশুভ্র রূপের মাঝে কালো কর্কশ অন্ধকার যেমন দেখিয়েছেন। তেমনি বম্বেতে এসে তিনি বর্ষার ভালোবাসায় প্লাবিত করেছেন জাতিভেদের নৌকা। বম্বে সিনেমা শুরু হয় ঝুম বর্ষার মাঝেই। এই বৃষ্টি ভালোবাসার জন্য সুখকর রিমঝিম কোন বৃষ্টি নয়, বরং সামনের মানুষের মুখও দেখা যায় না এমন অক্লান্ত মুষলধারে বৃষ্টি।

এরই মাঝে বম্বে থেকে আসা শেখরের দেখা হয় শায়লা বানুর সাথে। বৃষ্টি, বুরখা সব উপেক্ষা করে অশান্ত এক বাতাসে শায়লা বানুর স্বর্গীয় চেহারা উন্মুক্ত হয় শেখরের সামনে। লাভ এট ফার্স্ট সাইটই দেখিয়েছেন মণি রত্নম। শেখর শুধু চেহারাই দেখেছিল বুঝি, কালো বুরখা আর তার চোখে পড়েনি। টের পায়নি তখনো সে যে এই বৃষ্টি থামবে না আর, বাড়তেই থাকবে।

ঘটনা পরিক্রমায় বারবার শায়লা বানুর সাথে দেখা হয় তার আর আগ্রহ বাড়তে থাকে। শায়লাও টের পায় এই ছেলেটা তাকে ভালোবেসে ফেলেছে। হয়তো একপাক্ষিক ভালোবাসা ছিল, হয়তো শায়লাকে জোর করে ভালোবাসিয়ে নিয়েছে শেখর, কিন্তু শায়লাও ধীরে ধীরে অনুভব করা শুরু করে শেখরের প্রতি তার ভালো লাগাকে।

শেখরের মতো হুটহাট সিদ্ধান্ত নিতে পারে না সে, গ্রামের কোন সরল সোজা মেয়ের পক্ষেই সেটা নেয়া সম্ভব না। কিন্তু শায়লাকেও মণি রত্নম রোজার মতোই সাহসী দেখাতে চাইলেন যেন। পুরো পরিবারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সে শেখরের ভরসায় বম্বে চলে আসলো। সেখানে তারা সুখের সংসারও পাতলো। মণি রত্নমের কাছে ভালোবাসার পূর্ণতা সহবাসে। সহবাসকে উদযাপন করেছেন তিনি রোজা ও বম্বেতে।

রোজা সিনেমায় বিয়ের রাতের আসরে স্বামী-স্ত্রীর সহবাস নিয়ে রীতিমত উৎসব করেছেন গানে। বম্বেতে এসে আধুনিক ছোঁয়া লাগিয়েছেন, ঘরে থাকা অযাচিত বাচ্চাদের বিদায়ের পর স্বামী-স্ত্রীর প্রথম কাছে আসাকে ফাস্ট বিটের হাম্মা হাম্মা গান দিয়ে উদযাপন করেছেন খুব করে। বিরহকেও উদযাপন করার জন্য মণি রত্নম প্রকৃতি ও সঙ্গীতকে ব্যবহার করেছেন। ‘রোজা জানেমান’ আর ‘তু হি রে’ গানের যে কাতরতা, তা এখনো প্রতিটি প্রেমিক হৃদয়কে আর্দ্র করে দেয়। প্রেয়সীকে ছাড়া অনর্থক জীবন যাপন করার যে কষ্ট সেটি ভয়ঙ্কর সুন্দর করে কাশ্মীরের পাহাড়ের ভাঁজে আর বৃষ্টিমুখর সাগরের আগ্রাসী স্রোতে এই দুই গানে ব্যপ্ত করেছেন তিনি।

মুঝে কার কে জো ঘায়েল,
মুড়কে খাবার না লিয়া
নেহি তে ম্যা মার গায়া
তেরে ইশক নে নাচায়া
কারকে থাইয়া থাইয়া।

বুল্লে শাহ্‌র ‘থাইয়া থাইয়া’ গানে একপাক্ষিক ভালোবাসার প্রভাবটা মণি রত্নমকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তেরে ইশক নে নাচায়া কারকে থাইয়া থাইয়া- ভালোবাসায় সবকিছু হারিয়ে পাগলের মতো নাচার সঙ্গীতটা মণি রত্নম তার সিনেমায় আনতে চেয়েছিলেন।

‘তু হি রে’ গানের কাতরতা এখনো প্রতিটি প্রেমিক হৃদয়কে আর্দ্র করে দেয়

রোজা থেকেই একপাক্ষিক ভালোবাসার ঝলক দেখানো শুরু করেছিলেন মণি রত্নম। ঋষি কুমার আর শেখরের মাঝে সে একপাক্ষিক ভালোবাসার হাল না ছাড়া মানসিকতা, কিছু ক্ষেত্রে জোর করে চাপিয়ে দেয়া এগুলো উঠে আসছিল মাঝে মাঝেই। কিন্তু দিল সে তে এসে মণি রত্নম অমরের হাত ধরে সে একপাক্ষিক ভালোবাসার চূড়ান্ত রূপটাই দেখালেন যেন। প্রাচীন অ্যারাবিক লিটারেচারে থাকা ভালোবাসার সাতটি ধাপ নিয়ে মণি রত্নম সাজালেন দিল সে’র গল্প।

হাব্- হাব্ অর্থ আকর্ষণ। অল ইন্ডিয়া রেডিওর প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ অমর আসামের শিলচরে আসার সময় রেলওয়ে স্টেশনে দেখা পায় এক রহস্যময় নারীর। সে নারীতে মুগ্ধ অমর শিলচরে এসে আবার দেখে তাকে, পিছু নেয় তার। মেঘনা নামের সে মেয়েটি যে তার নিজের জীবন নিয়ে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছে স্বাভাবিকভাবেই অমরকে ঠুকরে দেয়। কিন্তু অমর এমন আকর্ষণ আগে কখনো কারো জন্যই যে অনুভব করে নি।

উন্স- উন্স অর্থ মায়া। ইংরেজিতে ইনফ্যাচুয়েশন বললে হয়তো আরও কিছু অনুভূতি কভার করে। অমর সে উন্সে পড়ে যায় মেঘনার। মেঘনার বারবার ঠুকরে দেয়া, রহস্যে আবৃত করে রাখা নিজেকে, চোখের ভাষায় অনেক কিছু বলতে চাওয়া এগুলো যেন মায়ায় ফেলে দেয় তাকে। যে মায়ার বাঁধন ছেড়াটা কষ্ট হয়ে যায় যদি সে ইশক স্তরে চলে যায়।

ইশক- মেঘনার সহচরদের কাছে মার খেয়ে অমর দমে যায় বটে কিন্তু যার জন্য হাব্ আর উন্স রয়ে যায় তাকে ভোলাটা সহজ না। অমরও ভুলতে পারে নি। মেঘনা যখনই তার সামনে আসে সে যেন আবার একপাক্ষিক সে ভালোবাসার জালে আবদ্ধ হয়ে যায়। লাদাখে দেখা হলে মেঘনার কাছ থেকে একটু স্পেস পেয়েই অমর টের পেয়ে যায় সে মেঘনাকে সত্যিকার অর্থেই ভালোবাসে।

আকিদাত- মেঘনাও হয়তো অমরের এই পাগলামি দেখে আকর্ষণ অনুভব করে কিন্তু সে তখনো হাব স্তরেই আছে, সর্বোচ্চ উন্স হতে পারে। কিন্তু সেটুকু পেয়েই অমর যেন বিশ্বাস (আকিদাত) করা শুরু করে যে সে মেঘনাকে পেয়ে গেছে। তার ভালোবাসার প্রতি তার একটা অন্ধবিশ্বাস চলে আসে। কিন্তু মেঘনা বিশ্বাস করতে পারে না, ভালোও বাসতে পারে না। তাই আবারও অমরকে ছেড়ে চলে যেতে তার দ্বিধা হয় না। কারণ সে জীবনে অন্যকিছু চায়, তার জীবনে ভালোবাসার আশ্রয় নেই এখন।

ইবাদাত- অমর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা করে। বিয়ে করে সংসারি হতে চায়। কিন্তু তার মনে মেঘনা রয়েই যায়। রেডিও স্টেশনে বসে সে যেন ‘এ আজনাবি, তু ভি কাভি, আওয়াজ দে কাহি সে’ গান প্লে করে মেঘনাকেই আমন্ত্রণ জানায়। সে মেঘনাকে হঠাৎ দিল্লীতে আবিষ্কার করে ও তার বাসায় থাকার সুযোগ দিয়ে অমর যেন এবার ইবাদত করা শুরু করে। যে মানুষ তাকে বারবার ছেড়ে চলে যায় এবং দর্শক জানে যে তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে স্বার্থসিদ্ধির জন্য তাকেই অমর যেভাবে ধ্যানজ্ঞান করে তাতে সেটিকে ইবাদতের পর্যায়েই বলা চলে।

জুনুন- ব্যক্তিকে, ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসাকে ইবাদতের পর্যায়ে নিয়ে গেলে তাকে রক্ষা করতে ও নিজের ভালোবাসার মর্যাদা বাঁচাতে একপাক্ষিক ভালবাসতে থাকা ব্যক্তি পাগলামি শুরু করে দেয়। একটা জুনুন ভর করে যেন তার ওপর। অমরও ব্যতিক্রম ছিল না, নিজের পরিবার, বাগদত্তাকে বিপদে ফেলে বারবার মেঘনাকে বাঁচাতে গিয়ে সে এই পাগলামির সাক্ষ্য রাখছিল। অন্যদিকে মেঘনা ওরফে মইনা তার নিজস্ব প্রতিশোধ নিতে সঙ্কল্পবদ্ধ হয়ে আত্মাহুতি দিতে চাচ্ছিল। কিন্তু কীভাবে সে আত্মাহুতি দেবে? তার জন্য যে একজন মাথায় জুনুন নিয়ে ঘুরছে।

মউত- যে ভালোবাসা ওপরের ৬টি স্তর পার করে আসে তার পূর্ণতা হয় মৃত্যুতে। দুটো মানুষই যদি হাব, উন্স, ইশক, আকিদাতে থামে তাহলে হয়তো পূর্ণতা পায় তাদের ভালোবাসা। কিন্তু একপাক্ষিক ভালোবাসায় যদি ইবাদাত আর জুনুনও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে আর অন্যদিকে অপরজনের যদি এখনো সেটা সর্বোচ্চ মায়ার স্তরে থাকে তাহলে সে ভালোবাসা জীবিত অবস্থায় কখনোই পূর্ণ হবার নয়। অমরও টের পেয়েছিল যে মইনা আত্মঘাতি বোমা হামলা করবেই, অমরের মৃত্যুও তাকে টলাতে পারবে না তার উদ্দেশ্য থেকে। অমর হয়তো যেতেই দিতো, হয়তো নিজের পরিবারকে বাঁচাতো কিন্তু সে ক্লান্ত। সে আর পারবে না মইনাবিহীন জীবন যাপন করতে আর চোখের সামনে মইনাকে মরতেও দেখতে পারবে না। তাই অমর মইনাকে জড়িয়ে ধরে, সে মৃত্যুবরণ করতে চায়। আর অন্যদিকে মইনা এমনিতেও মরে যেতে চায়। দুজন একসাথে যখন ‘মউত’এর কোলে ঢলে পড়ে তখন টের পাওয়া যায় যে একপাক্ষিক ভালোবাসা অনেক সময় এই মৃত্যুস্বাদের অনুভূতিই দেয়। হয় আমাদের থেমে যেতে হবে নাহলে নিঃশেষ হতে হবে।

রোজা, বম্বে ও দিল সে এই তিন সিনেমায় এই যে সন্ত্রাসবাদ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভালোবাসা ও বিরহের সন্নিবেশ হল সেটি পূর্ণতা পেতো না যদি এ আর রহমান না থাকতেন। কখনো কখনো তার সঙ্গীত ছাপিয়ে গিয়েছে সিনেমার দর্শন ও সময়কে। এমন দর্শনের চেয়েও সুপেরিয়র যে মিউজিক হতে পারে তাকে নিয়ে আলাদা করে না লিখলে হয় না আসলে। পরবর্তী পর্বে আলোচনা করবো এ আর রহমানের মিউজিক্যাল ট্রিলোজি নিয়ে। শত শত বছর যে গান, যে বেদনা, যে চিৎকার, যে সঙ্গীত আপনার কানে বাজতে থাকবে তার গল্পটাও তো জানা দরকার।

চলবে...

শেয়ারঃ


মিউজিক এন্ড টেরর- রত্নম ও রহমানের ভালোবাসার দর্শন!